নৌশিন নাওয়াল সুনম
রেলওয়েতে প্রায় ৭৫ শতাংশ ট্রেন লাইনচ্যুত হয় শুধু ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইনের কারণে। প্রতিনিয়ত ইলাস্টিক রেল (প্যান্ডেল) ক্লিপ ও নাট-বল্টু চুরি হওয়ায় ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন চালাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে বছরে প্রায় ৫ লাখ পিস ক্লিপ চুরি হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া পরিত্যক্ত রেললাইন, রেলবিট, লেভেল ক্রসিংয়ের রেল, ফিশপ্লেটও চুরি হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। চুরি যাওয়া এসব যন্ত্রাংশ দ্রুত লাগানোর নিয়ম থাকলেও বছরের পর বছর তা লাগানো হচ্ছে না। প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার সরকারি রেলওয়ে পরিদর্শক (জিআইবিআর) কর্তৃক লাইন পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রায় ১০ বছর ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথ পরিদর্শন করা হয়নি! এ অবস্থায় ক্লিপ, নাট-বল্টু সাপ্লাই ও প্রতিস্থাপনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে বিমানবন্দর রেল স্টেশন পর্যন্ত রেললাইন ঘুরে দেখা গেছে, রেলপথের শত শত ক্লিপ ভেঙে আছে। অনেক জায়গায় প্রয়োজনমতো পাথর নেই। কোথাও আবার লাইনের সংযোগস্থলে থাকা হুক খোলা রয়েছে। খিলগাঁও রেলগেট থেকে মগবাজার রেলগেট পর্যন্ত লাইনে শত শত ক্লিপ ভাঙা ও খোলা দেখা গেছে। কাওরান বাজার রেলগেট থেকে বিমানবন্দর রেল স্টেশন হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত লাইনেও একই অবস্থা। এছাড়া দুটি রেলপাতের সংযোগস্থলে চারটি করে আটটি নাট-বল্টু থাকার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে দু-একটি নাট-বল্টু রয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, গোটা দেশের রেলপথেই বছরের পর বছর মূল্যবান এ ক্লিপ ও যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা ঘটছে। খোয়া যাওয়া ক্লিপ বা যন্ত্রাংশ পূরণে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। ক্লিপ বা মূল্যবান যন্ত্রাংশে ‘বিআর’ (বাংলাদেশ রেলওয়ে) লেখা থাকলে চুরি রোধ করা সহজ হতো বলে অনেকেই মনে করেন। চুরি যাওয়া একটি ক্লিপ ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ এ ক্লিপ ও হুক শুধু চুরিই হয় না, ট্রেন চলাচলে ক্লিপ বা হুক ভেঙেও যায়। অনেক সময় এসব যন্ত্রাংশ স্টকে থাকে না। টেন্ডার শেষে এসব মালামাল পেতে প্রায় ছয়-সাত মাস লেগে যায়। ফলে ইচ্ছে থাকলেও খোয়া যাওয়া যন্ত্রাংশ দ্রুত লাগানো সম্ভব হয় না। আগে ভারত ও যুক্তরাজ্য থেকে প্রতিটি ক্লিপ ৬০০-৭০০ টাকা দরে কেনা হতো, এখন স্থানীয় বাজার থেকে ১৭৪ থেকে ২০০ টাকা দরে কেনা হচ্ছে। এসব ক্লিপ চুরিরোধক নয়। গত বছর ৮০ হাজার ক্লিপ নতুন করে লাইনে বসানো হয়েছে। অর্থ, জনবল ও পরিকল্পনার অভাবে রেল কর্তৃপক্ষ অচল প্রায়। সরকারিভাবে রেল বিভাগের সমস্যার জগদ্দল পাথর অপসারণ করা হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সারাদেশের প্রায় দেড় সহস্রাধিক লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত হয়ে পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। রেল চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গেজ রেলপথ। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৩০০ কিলেমিটার রেলপথে গতি কমেছে রেলওয়ের। সারাদেশের ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথের দেড় সহস্রাধিক লেভেল ক্রসিং ৬০০ কিলোমিটার রেলপথ আর ৬০০ রেলওয়ে ব্রিজ এখন রেল চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যা মানুষের মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। রেল বিভাগ এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনবল অর্থ সঙ্কট আর নীতিমালাহীনতার বৃত্তে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে লাখো মানুষ আর যানবাহন। বর্তমান সরকার রেলওয়েকে অত্যাধুনিক করতে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। অতিদ্রুত গতিসম্পন্ন বুলেট ও বৈদ্যুতিক ট্রেন যোগ হবে। কিন্তু পুরোনো রেলপথকে অবহেলিত রেখে, তাকে মেরামত ও সংস্কার না করে রেলওয়ের আধুনিকায়ন ফলপ্রসূ হবে না। বর্তমানে রেললাইনের অধিকাংশ জায়গায় ফিশপ্লেট, ক্লিপ, হুক, নাট-বল্টু খোলা। স্লিপারগুলোর অবস্থা খারাপ। লাইনে প্রয়োজনীয় পাথর নেই। সেতুগুলোর সংস্কার নেই বহুকাল। সেতুর স্লিপারের আয়ু শেষ। রেলপথ পরিদর্শনের যথেষ্ট ওয়েম্যান নেই। নাট-বল্টু, হুক, ফিশপ্লেট খসে পড়লেও দেখার কেউ নেই। কর্মকর্তাদের চোখ এখন মেগা প্রকল্পের দিকে। বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ কবির কথাই সত্য : থিংকস ফল অ্যাপার্ট, সেন্টার ক্যান নট হোল্ড। সবকিছু ভেঙে পড়লে রেললাইন ও রেলসেতু ভালো থাকতে পারে না। রেললাইনের নাট-বল্টু, ক্লিপ, হুক ঢিলা হয়েছে পরে; তার আগে প্রশাসনের নাট-বল্টু ঢিলা হয়েছে। প্রশাসন ও বিভিন্ন দপ্তরের নাট-বল্টু টাইট দিলেই রেলপথ ও রেলসেতুর নাট-বল্টু আপনাআপনি ঠিক হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়,পাবনা।
