পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগের রক্তক্ষয় ও সংঘর্ষ অবসানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পর হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কোনো তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনের কতিপয় নেতা ছাড়া তিন পার্বত্য জেলার অধিকাংশ সাধারণ উপজাতি সম্প্রদায় শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানায়। গত ২১ বছরে শান্তি চুক্তির অধিকাংশ শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা তা স্বীকার করতে চান না। তাদের অন্যতম হলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা দাবি করেন, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং মৌলিক বিষয়সমূহসহ দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে এক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, পক্ষান্তরে গোয়েবলসীয় কায়দায় অব্যাহতভাবে অসত্য তথ্য প্রদান করে চলেছে।
পার্বত্য শান্তি চুক্তির অগ্রগতি বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় এ পর্যন্ত শান্তি চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দফতর হস্তান্তর করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শান্তি চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো শান্তি চুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া আদালতে শান্তি চুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে আইনগত জটিলতা ছাড়াও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অন্যতম বড় বাধার সৃষ্টি করছে বলে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংগঠনের নেতারা সরকারকে দোষারোপ করে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, সরকারের আন্তরিকতা ও অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে শান্তি চুক্তির পর হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে মাত্র ৪৮ কি.মি. রাস্তা ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কি.মি. রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। পার্বত্যাঞ্চলে মোতায়নরত সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীকে ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাসে প্রত্যাবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া ব্যাপকভাবে লেগেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ ছিল না। সরকার সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করেছে। আশির দশকে যেখানে উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা ছিল মাত্র ১১টি, তা বেড়ে এখন হয়েছে ৪৭৯টি। প্রায় প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার হার ২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪.৬২ শতাংশে এ পৌঁছেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষার হার ৫৯.৮২ শতাংশ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র একটি থেকে বাড়িয়ে তিনটি করা হয়েছে। হাসপাতালের সংখ্যা তিনটি থেকে ২৫টিতে উন্নীত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে একসময় কোনো খেলার মাঠ ছিল না, বর্তমানে সেখানে ৫টি স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। কলকারখানা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ১৯৩টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১৩৮২টিতে উন্নীত হয়েছে। ফলে এককালের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি, সরকার চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উপজাতিদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা আছে, তারা ট্যাক্সের আওতামুক্ত। কিন্তু দেশে-বিদেশে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের জড়িয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হয়।
