সুতা-কাপড় আমদানির অনুমতি পেতে কারসাজি

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৫২

স্থানীয় চাহিদা মেটানো ও রপ্তানির জন্য ব্যবহার হওয়া সুতা ও বস্ত্র আমদানির অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের কারসাজির সন্ধান মিলেছে। স্থানীয় তাঁতিদের জন্য সরকারের দেওয়া রেয়াতি শুল্কে সুতা আমদানির সুবিধাও (হ্রাসকৃত হারে শুল্ক) চলে যাচ্ছে অন্যদের পকেটে। এসব সুতাই অবৈধ উপায়ে বিক্রি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সুতা আমদানির অনুমতি প্রদান ও তদারককারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডও যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং এখানেও কারসাজির মাধ্যমে অবৈধ ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিচ্ছেন।

এ ক্ষেত্রে নামে-বেনামে গজিয়ে ওঠা তাঁতি সমিতি ও তাঁত বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাঁত বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে আমদানি হওয়া সুতার পরিমাণ, এর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবহারের পরিমাণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে চেয়ে চিঠি পাঠাচ্ছে টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ। আজ মঙ্গলবার নাগাদ সংগঠনটি এ বিষয়ে তাঁত বোর্ডকে একটি চিঠি পাঠাবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে রপ্তানির উদ্দেশ্যে সুতা ও কাপড় আমদানির ক্ষেত্রে প্রাপ্যতার ঘোষণায়ও (ইউডি) বড়ো কারসাজির অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল আমদানিতে প্রাপ্যতার ঘোষণার (ইউডি) অনুমতি দেওয়া হয় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ ছয়টি অ্যাসোসিয়েশন থেকে। ইউডি দেওয়ার পর বায়ারের ক্রয়াদেশের পরিবর্তনের কারণে ইউডি সংশোধন করতে হয়। এই সংশোধন কতবার করা যাবে, তার কোনো সীমারেখা নেই। এই সংশোধনের আড়ালেই প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি কাঁচামাল আমদানি করা হয়। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি হওয়া ওই সুতা কিংবা কাপড় পরবর্তী সময়ে খোলাবাজারে চলে যাচ্ছে। মার খাচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।

স্থানীয় তাঁতিদের রেয়াতি শুল্কে (৫ শতাংশ) সুতা আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। তবে এসব তাঁতি যেহেতু অপেক্ষাকৃত ছোটো মূলধনের এবং প্রান্তিক পর্যায়ের, এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট সমিতির অনুমোদনের মাধ্যমে একসঙ্গে কয়েকজন তাঁতির সুতা আমদানি করার অনুমতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁত বোর্ডও সুপারিশ করতে পারে। এর ভিত্তিতে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট অফিস এই অনুমতি দিয়ে থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ খাতের একজন উদ্যোক্তা ইত্তেফাককে বলেন, যেসব তাঁতি ও তাঁত সমিতির নামে সুতা আমদানির সুপারিশ তাঁত বোর্ড থেকে নেওয়া হয়, তারা উদ্যোক্তা কি না, কিংবা অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তার খোঁজ নেওয়া দরকার। কোন সমিতি আবেদন করেছে, এর ভিত্তিতে কখন অনুমতি দেওয়া হয়েছে, আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে কী তৈরি করা হয়েছে, কিংবা কাদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে—এ বিষয়ে তথ্য খুঁজতে গেলে অনেক আমদানিকারকেরই অস্তিত্ব মিলবে না। কিন্তু এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই করার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রহস্যজনক কারণে তা অনুসন্ধান করছে না। কারা তাঁত বোর্ডের সুপারিশে সুতা আমদানি করছে, তার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত জানা প্রয়োজন।

বিটিএমএর একজন নেতা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি। তাতে দেখা গেছে, রেয়াতি সুবিধায় সুতা আমদানির সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যক্তিরা। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) তাঁত বোর্ডকে একটি চিঠি দেব।’

এ ছাড়া রপ্তানির কাঁচামাল হিসেবে সুতা কিংবা কাপড় আমদানির ক্ষেত্রেও বিস্তর অনিয়মের সন্ধান মিলেছে। এনবিআরের বিদ্যমান আদেশে (এসআরও), বিটিএমএ, গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ, বাংলাদেশ লেবেল ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএলএমইএ), টেরিটাওয়েল উত্পাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিটিটিএলএমইএ, টেক্সটাইল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশন (বিটিডিপিএ) সদস্য প্রতিষ্ঠানকে ইউডি প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে শর্ত রয়েছে, আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও উপকরণ নিজস্ব শিল্প ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার করা যবে না। অন্য কাজে ব্যবহার করা হলে প্রযোজ্য শুল্ককরসহ আইনানুগ শাস্তি মেনে নিতে হবে। অতীতের উত্পাদন ও রপ্তানি, উত্পাদন ক্ষমতা অনুযায়ী আমদানি, বার্ষিক উত্পাদন পরিকল্পনা প্রাক্কলন করে প্রতিবছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে একটি হিসাবপত্র সংশ্লিষ্ট শুল্ক স্টেশনের কমিশনারের কাছে জমা দিতে হয়। এর ভিত্তিতে আমদানিকৃত উপকরণ খালাস করা হবে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউজ কিংবা শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট এসব উপকরণ ব্যবহার হয়েছে কি না, তা সরেজমিনে পরীক্ষা করবেন।

সূত্র জানিয়েছে, ইউডি নেওয়ার পর তা ক্রয়াদেশের তারতম্যের কারণে সংশোধন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে একাধিকবারও তা সংশোধন করে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রথমে নেওয়া ইউডির তথ্য বন্ড অফিসের কাছে সংগঠনগুলো জানালেও পরে সংশোধনের বিষয়টি আর আমরা জানতে পারি না। ফলে প্রকৃত প্রয়োজনের চাইতে তিনি কত কম বা বেশি আমদানি করেছেন, তা জানা সম্ভব হচ্ছে না।’

যোগাযোগ করা হলে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবীর ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইউডি সংশোধনের পর প্রাপ্যতা বাড়িয়ে নেওয়ার বিষয়টি সংগঠনগুলো অনলাইনে হালনাগাদ না করায় আমরা তা জানতে পারি না। এ সমস্যা সমাধানে আমরা বন্ড অটোমেশনের উদ্যোগ নিয়েছি। বিজিএমইএর বর্তমান নেতৃত্বও আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া অনিয়মের মাধ্যমে আনা সুতা ও কাপড় বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে বিভিন্ন এলাকায় রাতভর অভিযান চালানো হচ্ছে। গত পাঁচ মাসে ৩০০ বন্ড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আরো ১০০ লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে।

সুতা আমদানি ও ব্যবহার-সংক্রান্ত কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউজ এবং শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রকৃতপক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ভ্যাট অফিস এ দায়িত্ব পালন করতে পারত। কিন্তু বিদ্যমান আদেশে স্থানীয় ভ্যাট অফিস এ দায়িত্ব পালন করতে পারে না। ফলে আইনগত মারপ্যাঁচ ও সমন্বয়হীনতার কারণেও এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কিংবা অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।