জামাই-শ্বশুরের মাছের মেলায় দুই কোটি টাকা হাত বদলের আশা

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫, ১৬:০৬

গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিনিরাইল গ্রামে প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে ‘জামাই-শ্বশুরের মাছের মেলা’। বরাবরের মতো এবারও দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ বিক্রির প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রায় আড়াইশ’ বছরের এই ঐহিত্যবাহী মেলা ঘিরে কালীগঞ্জজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ।

স্থানীয়রা জানান, বিনিরাইল গ্রামে প্রতিবছর ধান কাটা শেষে পৌষ সংক্রান্তিতে প্রতিবছর ফসলের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এ মেলা। প্রতিবারই অন্তত দেড় থেকে দুই কোটি টাকার হাত বদল হয় মেলা ঘিরে। এবারও তেমনটা আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। মূলত জামাইরা এ মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শ্বশুর বাড়িতে উপহার দেন। ঠিক একইভাবে শ্বশুররা মেলার বড় মাছটি কিনে নেন জামাইকে আপ্যায়নের জন্য। বছরের পর বছরজুড়ে এই রেওয়াজের কারণে মেলাটি ‘জামাই-শ্বশুরের মাছের মেলা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) মেলা ঘুরে দেখা গেছে, মেলা প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই বসেছে সারি সারি মাছের দোকান। সামুদ্রিক বড় মাছের পাশাপাশি এখানে দেশীয় প্রজাতির নানা মাছের সমাহার। মাছের মেলায় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি ও সুরে সুরে হাঁক ডাক করছেন দোকানীরা। বড় মাছ মাথার উপরে তুলে জানান দিচ্ছেন মেলার বড় মাছটি তিনি এনেছেন। দোকানীরদের এমন চটকদারিতে ক্রেতারাও ঝুঁকছেন স্টলগুলোতে। মেলায় ৩ শতাধিক মাছের স্টল ছাড়াও রয়েছে আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি, নিমকি-মোরালি, হাওয়াই মিঠাই, বস্ত্র, হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যেরও বাহার।

চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। সামুদ্রিক চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালিবাউশ, শাপলা মাছের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে নানা রকমের দেশি মাছও। বড় আকারের মাছ ঘিরে জটলা বেশি ক্রেতাদের। জামাই-শ্বশুরদের মধ্যেও হয় মাছ কেনার নীরব প্রতিযোগিতা।

প্রচলিত আছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনাকে ঘিরে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে ১৮ শতকে মেলাটির প্রচলন হয়। মূলত মাছ মেলা হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি জামাই মেলা নামে পরিচিতি পায়। প্রতি বছর মেলাকে কেন্দ্র করে বিনিরাইল ও আশপাশের কয়েক গ্রামের শ্বশুররা তাদের মেয়ের জামাইকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানায়। মেয়েরা তাদের স্বামীদের নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

মেলায় ঘুরতে আসা মো. তাহের বলেন, মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাইকে দাওয়াত করে আনা এই এলাকার মানুষের রীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর এই মেলায় দল বেঁধে ঘুরতে আসি। প্রচুর লোক সমাগম হয় তাই খুব ভাল লাগে।

তবে এবার মেলা ঘিরে কিছুটা হতাশার কথা জানিয়েছেন মেলার মাছ ব্যবসায়িরা। তারা জানান, প্রতিবছরই এই মেলায় তারা আসেন। অন্য বছর বেচাকেনা ভালো থাকলেও এবারের বেচাকেনা খুবই মন্দা ভাব যাচ্ছে। তারা সকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ বিক্রি করেন। মেলায় কেনার চেয়ে দেখতে আসা মানুষের ভিড় বেশী। তবে বেচা-কেনা যাই হোক স্থানীয় মানুষের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রতি বছরই আসেন বিক্রতারা।

বিক্রেতা সোলাইমান জানান, প্রতিবছর মেলায় দেড় থেকে দু্ই কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। এবারও তেমনটা আশা করছি। তবে এবার লোক সমাগম কিছুটা কম।

কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. আলাউদ্দিন বলেন, অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তিতে প্রতি বছর বিনিরাইল গ্রামে এই মাছের মেলার আয়োজন হয়। সাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে মেলায় থানা পুলিশ ও আনসার সদস্যের টহল থাকবে। এছাড়াও মেলায় কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য মেলা প্রাঙ্গণে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তনিমা আফ্রাদ বলেন, বিনিরাইলের মাছের মেলাটি স্থানীয় একটি ঐতিহ্য। বহু বছরের পুরনো এই মেলাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে নানা কথা। তবে ইতিহাস ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রাম-গঞ্জে এ ধরণের আয়োজন সত্যি আমাদের চিরায়ত বাংলার রূপই ফুটে উঠে।

ইত্তেফাক/এপি