যোগ্যতা থাকলে চাকরির অভাব হয় না

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৯, ১৯:০৩

 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের

প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. গোলাম রব্বানী সরদার। তিনি ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার হয়েছেন। তার

গল্প লিখেছেন— এম এম মুজাহিদ উদ্দীন

জী বনের নানা বাঁক পেরিয়ে তিনি আজকে তার স্বপ্নকে ছুঁতে পেরেছেন। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলার বোয়ালদাড় গ্রামে তার বেড়ে ওঠা। বাবা মো. মোসলেম উদ্দীন সরদার একজন কৃষক। আর মা মোছা. আক্তারা বিবি গৃহিণী। কৃষক বাবার অভাব-অনটনের সংসারে ছোটোবেলায় তেমন ভালো শিক্ষার্থী ছিলেন না; কিন্তু হঠাত্ করে অষ্টম শ্রেণিতে একটা ঘটনার কারণে জীবনের মোড় কিছুটা ঘুরে যায়। কী ছিল ঘটনা? জানতে চাইলে গোলাম রব্বানী বলেন, ‘বোয়ালদাড় দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় সামাজিক বিজ্ঞান ক্লাসে একদিন আ. বারী স্যার একটা প্রশ্ন জিঙ্গাসা করেছিলেন; কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরটা কেউ দিতে পারছে না। তখন আমি দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নের উত্তরটা দিয়েছিলাম। তখন স্যার আমার প্রশংসা করে বলেছিলেন, গোলাম রব্বানী তো ভালো স্টুডেন্ট হয়ে গেছে।

স্যারের সেদিনের সেই কথা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমি নতুন উদ্যমে পড়ালেখা শুরু করেছিলাম। মা-বা সব সময় অনুপ্রেরণা দিত। সেবার বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নির্বাচিতও হয়েছিলাম। বৃত্তি না পেলেও পড়ালেখার উদ্যম আর থামায়নি।’ এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে জিপিএ ৪.১৩ পেয়ে মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোন। তারপর ভর্তি হন বিরামপুর সরকারি কলেজে। বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও ইংরেজি বিষয়ে আসক্তি তৈরি হয়; তাই উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্বপ্ন দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হবেন; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির জন্য কোচিং করার টাকাও ছিল না। ভর্তি প্রস্তুতির পুরাতন বই সংগ্রহ করে বাড়িতে বসেই প্রস্তুতি শুরু করেন। তারপর ঢাকায় পাড়ি জমান। এই স্বপ্নজয়ী বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে ৫৭০ টাকা নিয়ে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এলাম।

ঢাকায় আসার পর থেকেই জীবনকে জানতে শিখলাম, বাস্তবতা বুঝতে শিখলাম। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এর পাশে পরিচিত এক ভাইয়ের মেসে উঠলাম। ৫৭০ টাকা থেকে মেসের খরচসহ অন্যান্য খরচ বাবদ টাকা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভর্তি পরীক্ষার ফরম কেনার টাকা ছিল না। মেসের এক ভাই আমাকে ৫০০ টাকা ধার দেন। সেই টাকা দিয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফরম কিনি; কিন্তু প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হলো না।’ গোলাম রব্বানীর মন ভেঙে গেলো। তারপর টিউশনি করেন আর ভর্তি প্রস্তুতি নিতে থাকেন। দ্বিতীয় বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে পড়ার সুযোগ পান। প্রথম শ্রেণিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ফলাফল করেন। তবে মনে স্বপ্ন ছিল একদিন ভালো কিছু করবেন। সব কষ্ট দূর হবে। বাবা-মার বুক গর্বে ভরে যাবে। গোলাম রব্বানী স্নাতকোত্তরে পড়াকালীনই আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে সিনিয়র ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর আর থেমে থাকেননি। একেরপর এক চাকরি পেয়েছেন।

প্রথমবার বিসিএস নন-ক্যাডারে প্রাইমারির প্রধান শিক্ষক, সিলেট ক্যাডেট কলেজে প্রভাষক, আর ঠাকুরগাঁও-এ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ইংলিশে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। আবার স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকতা করেছেন, টিউশনি করেছেন। এগুলো বিসিএসে বেশ কাজে দিয়েছে। ধৈর্য ধরে নিয়মিত বাসায় বসে মডেল টেস্ট দিতেন। চাকরির পাশাপাশি যতটুকু সময় পেতেন সেই সময়টুকু পড়তেন। যেখানেই যেতেন সেখানে বই নিয়ে যেতেন। এভাবে লেগে থাকার ফলে বিসিএস পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা এসেছে। এখন তিনি ভালো প্রশাসক হিসেবে জনগণের সেবা করতে চান। গোলাম রব্বানী বিশ্বাস করেন, ‘যোগ্যতা থাকলে চাকরির অভাব হয় না। আর যদি কারোর স্বপ্ন থাকে, সে স্বপ্ন পূরণের একান্ত প্রচেষ্টা থাকে। তাহলে দেরিতে হলেও সে স্বপ্ন পূরণ হয়’।