কিছু বয়স্ক জাপানি কেন জেলে যেতে পছন্দ করেন?

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৫, ১৬:২৯

কক্ষগুলো বয়স্ক লোক দিয়ে ভরা। তাদের হাতের চামড়া কুঁচকে গেছে, অনেকের পিঠ বাঁকানো। তারা ধীরে ধীরে করিডোর দিয়ে নেমে আসে, কেউ কেউ হাঁটার যন্ত্র ব্যবহার করে। শ্রমিকরা তাদের গোসল করতে, খেতে, হাঁটতে ও ওষুধ সেবন করতে সাহায্য করছে।

তবে এটি কোনো নার্সিং হোম নয়। এটি জাপানের সবচেয়ে বড় নারীদের কারাগার। এখানে এতো লোক মূলত বাইরের বয়স্ক সমাজের একাকীত্বের বিস্তৃত সমস্যাকে প্রতিফলিত করে। কারাগারের রক্ষীরা বলছিলেন, বাইরে একাকীত্ব কিছু লোকের জন্য এত তীব্র যে, তারা কারাগারে থাকতে পছন্দ করে।

টোকিওর উত্তরে অবস্থিত তোচিগি নারী কারাগারের কর্মকর্তা তাকায়োশি শিরানাগা সেপ্টেম্বরে সিএনএনকে সেখানে পরিদর্শনের সময় বলেন, এমন লোকও রয়েছেন যারা বলেন, চিরকাল এখানে বসবাসের জন্য মাসে ২০,০০০ বা ৩০,০০০ ইয়েন (১৩০-১৯০ ডলার) প্রদান করবে!

কারাগারের হালকা গোলাপী দেয়াল এবং শান্ত হলের মধ্যে সিএনএন ৮১ বছর বয়সী আকিয়োর সঙ্গে দেখা করে। ছোট ধূসর চুল এবং হাতে বয়সের দাগ স্পষ্ট। তিনি দোকানে খাবার চুরির জন্য কারাগারে আসেন। তিনি বলেন, এই কারাগারে খুব ভালো ভালো মানুষ রয়েছে। সম্ভবত এই জীবনটিই আমার জন্য সবচেয়ে স্থিতিশীল।

নারীরা কারাগারের পেছনের অংশে বসবাস করেন। তাদের কারাগারের কারখানায় কাজ করতে হয়। তবে কেউ কেউ কাজ করেন না। ভেতরে তারা নিয়মিত খাবার, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং বয়স্কদের যত্ন পান। তবে বাইরে তাদের সঙ্গ দেওয়া লোকের অভাব।

৫১ বছর বয়সী ইয়োকো নামের এক বন্দিকে গত ২৫ বছরে মাদকের অভিযোগে পাঁচবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, যতবার তিনি ফিরে আসেন, ততবারই মনে হয় কারাগারের লোকজন বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। যদি অর্থ শেষ হয়ে যায় (কিছু লোক) ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ কাজ করে এবং ধরা পড়ে, যাতে তারা আবার কারাগারে আসতে পারে।

আকিয়ো বিচ্ছিন্নতা এবং দারিদ্র্যের বোঝা খুব ভালো করেই বোঝেন। এর আগে ষাটোর্ধ্ব এই নারী খাবার চুরির দায়ে কারাগারে যাওয়ার পর এটি তার দ্বিতীয় মেয়াদ। তিনি বলছিলেন, আমি যদি আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হতাম এবং আরামদায়ক জীবনযাপন করতাম তবে আমি অবশ্যই এটি করতাম না।

যখন তিনি দ্বিতীয়বার চুরি করেছিলেন, সেই সময়টাতে তার পেনশনের আর অল্প কিছু টাকা বাকি ছিল। এরপর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো খাবার চুরি করেন কারাগারে আসার জন্য।

তবে শুধু যে অর্থই এখানে প্রধান কারণ ছিল বিষয়টি এমন নয়। কারাগারে যাওয়ার আগে তার ৪৩ বছর বয়সী ছেলে একই সঙ্গে থাকতেন। সেই ছেলে প্রায়ই তাকে বলতেন, 'আমি চাই তুমি এখান থেকে চলে যাও।' তিনি বলেন, তখন আমি ভেবেছিলাম, আমার বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। আমি কেবল মরতে চাই।

কারারক্ষী শিরানাগা বলেন, অনেক মানুষ এখানে আসে শীতের কারণে অথবা ক্ষুধার্ত থাকার কারণে। যারা অসুস্থ হয়ে পড়ে তারা কারাগারে থাকাকালীন বিনামূল্যে চিকিত্সা পেতে পারে। তবে একবার তারা চলে গেলে তাদের নিজেদেরই এর জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। তাই কিছু লোক যতদিন সম্ভব এখানে থাকতে চায়। দোষী সাব্যস্ত অপরাধীদের কাছে এই জায়গাটিকে কারাগারের চেয়ে নার্সিং হোমের মতো মনে হয়।

জাপানে কারাগারে বন্দি বয়স্ক নারীদের সবচেয়ে সাধারণ অপরাধ হলো চুরি। এই প্রবণতা পুরুষদের মধ্যেও দেখা যায়।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশব্যাপী ৮০ শতাংশের বেশি বয়স্ক নারী বন্দি চুরির দায়ে কারাগারে ছিলেন। দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ২০ শতাংশ লোক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে।

জাপানজুড়ে ২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বন্দির সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে। এটি কারাগারের ধরণকেও পরিবর্তন করেছে।

কারারক্ষী মেগুমি বলেন, সাবেক বন্দিদের জন্য সমস্যার আরও একটি কারণ হলো, সমাজে পুনরায় প্রবেশের পর তাদের সহায়তার লোকের অভাব। তারা মুক্তি পেলেও এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পরও তাদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। এমনও মানুষ আছেন, যারা বারবার অপরাধ করে পরিবার পরিত্যক্ত হয়েছেন। তাদের এখন থাকার কোনো জায়গা নেই।

কর্তৃপক্ষও বিষয়টি স্বীকার করেছে। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় নারী বন্দিদের জন্য প্রোগ্রাম চালু করেছে। এর আওতায় তাদের স্বাধীন জীবনযাপন, মাদক আসক্তি থেকে পুনরুদ্ধার এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলো কীভাবে জোড়ালো করা যায়, সে সম্পর্কে গাইডেন্স করা হয়। জাপান সরকার এখন প্রবীণদের জন্য আবাসন সুবিধা সামর্থের মধ্যে আনার প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

ইত্তেফাক/এসকে