মোটরবাইকে ৬ দিনে ৬৪ জেলা!

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৯, ১৯:০৮

>> সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

 

মোহাম্মদ সাদিকুল্লাহ বড় হয়েছেন দিনাজপুর শহরে। বাড়িতে মোটরবাইক থাকায় স্কুুলে পড়ার সময়ই টুকটাক চালানো শিখে ফেলেন। মাধ্যমিকের পর ঢাকায় এসে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে ভর্তি হন। কলেজে পড়ার সময় কয়েক বন্ধু মিলে একটা মোটরবাইক কিনে ফেলেন। এরপর উচ্চতর পড়াশোনা করতে যান দেশের বাইরে, চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৮ সালে দেশে ফিরে একটি মার্চেন্ডাইজিং কোম্পানিতে ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। কল্যাণপুর থেকে বনানী অর্থাত্, বাসা থেকে অফিসে আসা-যাওয়া করে বুঝতে পারেন, প্রতিদিনই জ্যাম ঠেলে এই পথটা পার করা বেশ ঝক্কির। ফলে সময় বাঁচাতে কিনে নেন মোটরবাইক। সেই মোটরবাইক হাঁকিয়েই এই তরুণ ঘুরেছেন পুরো বাংলাদেশ। তাও মাত্র ছয়দিনে! শুধু দেশে নয়, বাইক চালিয়ে ছুটে গেছেন নেপালের কাঠমান্ডুসহ ভারতের লাদাখে। হুট করেই কি এভাবে বেরিয়ে পড়া সম্ভব? সাদিকুল্লাহ্ বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত ছিলাম, ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতাম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি বলে যখন-তখন ছুটি পাওয়া যায় না। তাই যখনই সুযোগ হলো, তখনই বেরিয়ে পড়লাম। শখের কাছে দুর্গম পথ বাধা হতে পারেনি।’

মোটরবাইক কেনার পর সেটা চালিয়ে শুধু অফিসে নয়, প্রায়ই চলে যেতেন নিজের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। ফেসবুকে মোটরবাইকারদের গ্রুপ বিডি রাইডার্স ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে ঘুরতে বের হতেন। এভাবে একবার বেরিয়ে পড়েন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ভ্রমণে। ২০১৩ সালে একবার ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া চলে যান। তখনই তাঁকে রোমাঞ্চ পেয়ে বসে, সিদ্ধান্ত নিলেন, ৬৪ জেলার মাটি স্পর্শ করবেন। এরপর সুযোগ এলে বেরিয়ে পড়লেন বাইক নিয়ে।

২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করেন দেশঘোরার লক্ষ্যে। অফিস ছিল তখন নারায়ণগঞ্জে। প্রথমদিনই অফিসের ফাঁকে ৩ ঘণ্টায় ঢাকাসহ আশপাশের চার জেলা ঘোরা শেষ করেন। তার হিসাবে, এক জেলা থেকে আরেক জেলা যেতে এক ঘণ্টা লাগে, তাহলে দিনে ১৫ জেলা ঘোরা সম্ভব। ৬০ জেলার জন্য তাহলে আর চারদিন বরাদ্দ। ঢাকা থেকে বের হলেন ১৬ ডিসেম্বর, ছুটির দিন। ভোরবেলা বসুন্ধরা তিনশ ফুট সড়ক দিয়ে বের হয়ে সিলেটের দিকে রওনা হলেন। তারপর একটানা ঘুরতে থাকেন। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ হয়ে বগুড়ায় বিরতি নিয়েছিলেন। পরদিন ভোরে আবার গাইবান্ধা হয়ে যাত্রা শুরু করেন। শেষমেশ পাঁচদিনে শেষ হলো ৬৪ জেলা। ভ্রমণের পুরো রোডম্যাপ, খরচের হিসাব, সময়ের হিসাবসহ সবকিছু নিজের ফেসবুক পেজেও শেয়ার করেছেন তিনি। বাইক চালিয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। ২০ ডিসেম্বর কক্সবাজার গিয়ে শেষ হয় তার ৬৪টি জেলার মাটি স্পর্শ করার যাত্রা।

২০১৭ সালে নেপালের মুস্তাং উপত্যকায় গিয়েছিলেন চারজন। কঠিন ও দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয় সেবার। নেপাল গেছেন ছয়বার। পাহাড়ি রাস্তায় মোটরবাইক চালিয়েছেন। প্রথমবার কক্সবাজার থেকে গিয়েছিলেন কাঠমান্ডু। মাটি আর পাহাড়ের পাথুরে রাস্তায় একটু এদিক ওদিক হলেই খাদে পড়ার আশঙ্কা ছিল। সেই এবড়োথেবড়ো পথেই গন্তব্যে পৌঁছেছেন। পরেরবার ভারত গিয়েছিলেন যশোরের বেনাপোল হয়ে।

সাদিকুল্লাহ্র ঘোরাঘুরি থেমে নেই। এবার তাঁর লক্ষ্য, এশিয়া মহাদেশের বাইরে যাবেন। সময় পেলেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চান। মোটরবাইকের দুই চাকায় করে দুরন্ত এই তরুণের ইচ্ছা নিশ্চয়ই পূরণ হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।