বিদেশি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনায় বাংলাদেশ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৯, ২১:২৭

ড. শরীফ এনামুল কবির

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের বারতা আজ চারদিকে। বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতার মেঘ কেটে গেছে বহু আগেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। উত্পাদিত পণ্যের বিশাল বাজার, সস্তা শ্রম, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা ও বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ প্রণোদনায় বিদেশি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বর্তমানে অন্তত ১৭টি খাতে কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছেন বিদেশিরা। তাদের মুনাফা প্রত্যাবাসন বা ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বিধি-বিধান শিথিল করা হয়েছে। মুনাফাসহ শতভাগ মূলধন ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় যন্ত্রপাতির অবচয় সুবিধা, শুল্কমুক্ত যন্ত্রাংশ আমদানি এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বিদেশিরা। এসব সুযোগ-সুবিধার জন্যেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

২০১৮ সালে দেশে প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে তিন দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল দুই দশমিক এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহ ছিল ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১২ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১০৮ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে নিয়ে আসা নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১২ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা ২০১৭ সালে ছিল ৫৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এ হিসেবে এক বছরে দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। ২০১৯ সালেও দেশে-বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের মধ্য দিয়ে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সম্ভাবনার এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিং জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে গত ১ জুলাই পাঁচ দিনের সরকারি সফরে লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ান পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ঢাকা এবং বেইজিংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ৯টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে দুই দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড করপোরেশন অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ডিপিডিসি প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এই অর্থ দিচ্ছে। সফরকালে চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া পণ্যের বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়াতে চীনা ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বস্ত্র ও চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগ করার সুযোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। চীনা উদ্যোক্তারাও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই সফর একটি মাইলফলক। শেখ হাসিনার চীন সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপের কারণে চীন-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন আরো বেশি সুদৃঢ়।

প্রায় ১৩৮ কোটি জনসংখ্যার আর ৯৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট দেশ চীন বর্তমানে অর্থনীতিতে বেশ শক্তিশালী। ক্রয়ক্ষমতার সমতার বিচারে চীনের অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৮.১৮৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৭৮ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের অবতারণার পর থেকে একুশ শতকের শুরুতে এসে চীনা অর্থনীতি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের এক নম্বর পণ্য রপ্তানিকারক ও দ্বিতীয় আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিগত ৩০ বছর ধরে চীন প্রায় ১০% প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। আর গত ১০ বছরে চীনের এই অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং ক্ষিপ্র। চীন যেভাবে অর্থনীতিতে উন্নতি করছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে চীন হবে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি। তাই চীনকে ঠেকাতে পশ্চিমা বিশ্ব নানা কৌশল অবলম্বন করছে। ইতিমধ্যে চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আশার বিষয় হলো চীন-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চীন থেকে ১২ শতাংশ কম পণ্য আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি বেড়েছে ১৪ শতাংশ। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের জরিপের তথ্য মতে, গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণার পর বাড়তি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ শতাংশ কোম্পানি চীন থেকে তাদের কারখানা সরিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। ফলে চীনের হারানো বাজার ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য।

১৯৭৮ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা থেকেই চীন বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কয়েক দশক ধরে চীন প্রধানত বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীনের সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবকাঠামো, বিদ্যুত্, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাতে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছে চীন। দেশটি বিভিন্ন খাতে ১ হাজার ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে বিদ্যুত্ খাতে বিনিয়োগ করেছে ৮৩৪ কোটি ডলার। এছাড়াও নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতে ১১৩ কোটি ডলার, বস্ত্র খাতে ৪০ কোটি, ব্যবসা খাতে ১৫ কোটি এবং অন্যান্য খাতে ১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে দেশটি।

দেশে বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড়ো উত্সও এখন চীন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে চীন থেকে দেশে বিনিয়োগ এসেছে ৮১০ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে চীনে শ্রমের মজুরি বেড়েছে। দেশটি এখন উচ্চপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। এ পরিস্থিতিতে দেশটি থেকে অনেক বিনিয়োগ অন্য দেশে সরে যাচ্ছে। এ কারণে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় গন্তব্য হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। সমপ্রতি চীনের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসহ আরো কিছু খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে চীন বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কুনমিং আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড ইস্পাতশিল্পে ২৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। ২০ লাখ টন উত্পাদন ক্ষমতার একটি ইস্পাত কারখানা এবং বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা। এজন্য প্রায় ১ হাজার একর জমি ইজারার আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চীনের আরেক বড়ো প্রতিষ্ঠান ঝেজিয়াং জিনজুন হোল্ডিং গ্রুপ মিরসরাইয়ে বিদ্যুত্ কেন্দ্র করার জন্য ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এজন্য ১ হাজার একর জমি ইজারা নিয়ে মূল্যের প্রথম কিস্তি ৭ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধও করেছে তারা।

মূলত একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূলেই রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে শেখ হাসিনার সরকার। বিনিয়োগ বিকাশে সরকার বিভিন্ন বিনিয়োগবান্ধব কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি ইকোনমিক জোন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সেখানে বিদেশিদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ অঞ্চল।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে প্রতিষ্ঠা করা হবে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীন তাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে। চট্টগ্রামের মিরসরাই, বাগেরহাটের মোংলা ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ভারত প্রতিষ্ঠা করবে তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এছাড়া বিদেশিদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, হংকং, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে বিনিয়োগ করবে শতশত বিলিয়ন ডলার। এসব দেশের সঙ্গে সরকারের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৮৮টি অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ বিদেশি বিনিয়োগ টানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

n লেখক : সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন, সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল : [email protected]