ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ
দেশের অমিত সম্ভাবনাময় মত্স্যসম্পদের টেকসই উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও ভবিষ্যত্ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের আপামর জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিবারের মতো এবারও ১৭ থেকে ২৩ জুলাই দেশব্যাপী উদ্যাপিত হচ্ছে জাতীয় মত্স্য সপ্তাহ ২০১৯। এবারের মত্স্য সপ্তাহের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মাছ চাষে গড়বো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। মত্স্য সপ্তাহ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বর্ণাঢ্য সড়ক শোভাযাত্রা, সংবাদ সম্মেলন, মত্স্য মেলা আয়োজন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গণভবনস্থ লেকে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ, কর্মশালা, দৈনিক পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ, মত্স্যবিষয়ক তথ্যচিত্র প্রদর্শনী ইত্যাদি। মত্স্যসম্পদ উন্নয়নের বিপুল সম্ভবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে অধিকতর মজবুত ও স্থায়ীত্বশীল করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে দেশবাসীকে আরো সচেতন ও সম্পৃক্ত করাই এ সপ্তাহের প্রধান উদ্দেশ্য।
মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ চাষ ও ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। মাছের উত্পাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ইতিমধ্যে মত্স্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক ৬২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তির মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় ২০ প্রজাতির মাছের পোনা উত্পাদন ও চাষ, কই মাছের রোগ প্রতিরোধে ভেকসিন উদ্ভাবন, একোয়াপনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ ও সবজি উত্পাদন, নোনা টেংরা ও পারশে মাছের পোনা উত্পাদন, কই, সাদা পাঙাশ, রুই, তেলাপিয়া ও সরপুঁটি মাছের জাত উন্নয়ন, শীলা কাঁকড়ার পোনা উত্পাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মিঠা পানির ঝিনুকে মুক্তা উত্পাদন, ক্রিকে মাছ চাষ, সমুদ্র উপকূলে সিউইড চাষ, ফিশ ড্রায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উত্পাদন, ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে ব্যবস্থাপনা কৌশল উদ্ভাবন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তি মত্স্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে মাছের উত্পাদন দাঁড়িয়েছে ৪২.৭৭ লক্ষ মেট্রিক টন। ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম (৫.১৭ লক্ষ মে. টন), তেলাপিয়া উত্পাদনে বিশ্বে চতুর্থ (প্রায় ৪.০ লক্ষ মে.টন) এবং এশিয়াতে তৃতীয়।
মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। ইনস্টিটিউট থেকে ইতিমধ্যে বিলুপ্তপ্রায় ২০ প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন এবং চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, কই, শিং, মাগুর, ভাগনা, গুজি আইড়, চিতল, ফলি, মহাশোল, গুতুম ও কুচিয়া উল্লেখযোগ্য। ফলে বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রাপ্যতা বর্তমান বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রচলিত মত্স্যসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত মত্স্যসম্পদ, যেমন—শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, কুঁচিয়া ও সিউইড (সামুদ্রিক শৈবাল) উন্নয়নে ইনস্টিটিউট কর্তৃক গবেষণা পরিচালনা করে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জিত হয়েছে। এসব মত্স্যজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ইনস্টিটিউট থেকে পরিচালিত গবেষণায় কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে এ পর্যন্ত ১১৭ প্রজাতির সিউইড শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ প্রজাতির সিউইড বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন। ইনস্টিটিউট থেকে ইতোমধ্যে তিন প্রজাতির সিউইড চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব সিউইড উন্নত খাদ্যমান ও ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং প্রাকৃতিক মিনারেল-সমৃদ্ধ, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে সিউইড কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে। অপরদিকে, অপ্রচলিত মত্স্যসম্পদের মধ্যে ওয়েস্টার অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি প্রজাতি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রজাতির ওয়েস্টার সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে।
অপরদিকে, আমাদের আছে ৩৯ লক্ষ হেক্টর অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় ও ৮ লক্ষ হেক্টর হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়। প্রায় ৫৭ শতাংশ উত্পাদন আসে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয় থেকে এবং ২৭ শতাংশ আসে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের মত্স্য খাত বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও সময়কাল পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র ক্রমশ সংকুচিত ও বিনষ্ট হচ্ছে, সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে দেশীয় মাছের অবাধ বংশবিস্তার। এ বিবেচনায় মত্স্য উত্পাদনের বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখাই আমাদের জন্য আগামী দিনের বড়ো চ্যালেঞ্জ।
n লেখক : বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা
ইনস্টিটিউটের গবেষক
