সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন সেনাপ্রধান, বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে রংপুর জেলা শহরে নিজবাড়ি ‘পল্লীনিবাস’-এর পাশেই লিচু বাগানে বাবা মকবুল হোসেনের কবরের পাশে গতকাল মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৬টার দিকে সমাহিত করা হয়েছে। এর আগে বাদ জোহর রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে মরহুমের চতুর্থ ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় লক্ষাধিক লোক অংশ নেন। ঢাকায় বনানী সামরিক কবরস্থানে নাকি রংপুরে সমাহিত করা হবে—মৃত্যুর পর থেকে এনিয়ে দলের ভেতরে উত্তেজনা ও নাটকীয়তা শেষে রংপুরের নেতাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী নিজের দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতেই তাঁকে দাফন করা হলো। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় তাঁকে।
এরশাদের শেষ জানাজা ও দাফনে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজ্জামেল হক উপস্থিত ছিলেন। দাফনের আগে সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তাঁর কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সেনাবাহিনীর রংপুর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল নজরুল ইসলাম। দাফনের সময় এরশাদের ছোটো ভাই জি এম কাদের, ছেলে শাদ এরশাদসহ আত্মীয়স্বজন এবং জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবুল, জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, আযম খান, মেজর (অব) খালেদ আখতার, এ টি ইউ তাজ রহমান ও শফিকুল ইসলাম সেন্টুসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) রবিবার সকালে এরশাদ মারা যাওয়ার পর ঐদিনই তাঁর স্ত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ ঘোষণা দেন, এরশাদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। জাপার প্রেস উইং থেকেও প্রথমদিন থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফায় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছিল সামরিক কবরস্থানে দাফনের কথা; কিন্তু শুরু থেকেই রংপুরে দাফনের দাবি জানাচ্ছিলেন রংপুরের নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুরে এরশাদের মরদেহ জানাজার জন্য রংপুরে নেওয়ার পর স্থানীয় নেতাকর্মীরা সেখানে দাফনের জোরালো দাবি তোলেন। আগেরদিন তারা পল্লীনিবাসের পাশে কবরও প্রস্তুত করে রাখেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবির মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন রওশনসহ দলের দায়িত্বশীল নেতারা। জানাজা শেষে এরশাদের কফিন আর ঢাকায় ফিরিয়ে না এনে নিয়ে যাওয়া হয় পল্লীনিবাসে। বিকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশবাসীর উদ্দেশে রওশন বলেন, ‘রংপুরবাসীর আবেগ ও ভালোবাসার সম্মানার্থে তাঁকে রংপুরে সমাহিত করার বিষয়ে আমি ও আমাদের পরিবার সম্মতি প্রকাশ করছি।’ অন্যদিকে, জাপার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, রংপুরে সমাহিত করার সম্মতি দিয়ে এরশাদের কবরের পাশে রওশন তার জন্যও কবরের জায়গা রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
গতকাল ঢাকা সিএমএইচ থেকে এরশাদের কফিন নিয়ে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার। কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে রংপুর জেলা পুলিশ। এরশাদের কফিন দুপুরে ঈদগাহ মাঠে নেওয়ার পর জানাজার আগে দেওয়া বক্তব্যে রংপুরের মেয়র ও জাপা নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ‘বনানীর সেনা কবরস্থানে এরশাদকে দাফন করা হলে পরবর্তীতে দলের সাধারণ নেতা-কর্মীরা শ্রদ্ধা জানাতে সহজে সেখানে যেতে পারবেন না। এরশাদ নিজেই রংপুরে শায়িত হতে চেয়েছিলেন।’
এরপর জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের বক্তব্য দিতে শুরু করলে মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার নেতা-কর্মী রংপুরে দাফনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রায় ২০ মিনিট ধরে এই পরিস্থিতি চলার পর দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে জানাজা শুরু হয়। জানাজা পড়ান রংপুর কারীমিয়া মাদ্রাসার সুপার মাওলানা ইদ্রিস আলী। ঈদগাহ মাঠে মরদেহ আসার পরপরই ‘হামার অংপুরের ছাওয়াল’ খ্যাত এরশাদকে শেষবারের মতো দেখতে ও জানাজায় অংশ নিতে মানুষের ঢল নামে। পুলিশি বেষ্টনী ভেঙে মরদেহের কাছে ছুটতে থাকেন দলীয় নেতা-কর্মী ও রংপুরের স্থানীয় সাধারণ মানুষ। উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে শুরু হয় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন। জাপার নেতা-কর্মীরা ছাড়াও স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ব্যবসায়ী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
জানাজার পরপরই রংপুরের নেতা-কর্মীরা এরশাদের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ফেলেন এবং রংপুরে দাফনের দাবিতে স্লোগান ধরেন। একপর্যায়ে মেয়র মোস্তফা ঐ গাড়িতে উঠে চালকের পাশের আসনে বসে পড়েন। বেলা ৩টার দিকে এরশাদের মরদেহ নিয়ে গাড়ি পল্লীনিবাসের দিকে রওনা হয়। এই পরিস্থিতিতে জি এম কাদের বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই চাচ্ছিলাম এরশাদকে রংপুরে সমাহিত করব। তবে ভাবি (রওশন) বিভিন্ন কারণে চাচ্ছিলেন তাঁকে ঢাকায় দাফন করতে। তবে রংপুরের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার কারণে সর্বসম্মতভাবে আমরা তাঁকে এখানেই সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিই। ভাবিও এতে রাজি হয়েছেন।’ এই সিদ্ধান্তের পর সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধিদল পল্লীনিবাসের পাশে এরশাদের বাবার নামে গড়া মকবুল হোসেন জেনারেল অ্যান্ড ডায়াবেটিক হাসপাতাল সংলগ্ন লিচুবাগানে কবরের স্থানটি পরিদর্শন করে।
রংপুর মহানগর জাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে জাপা ও অঙ্গ-সংগঠনের কয়েকশ নেতা রংপুরে এসেছেন। এছাড়া রাজশাহী বিভাগ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ জানাজায় শরিক হন। এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রংপুর জেলা দোকান মালিক সমিতি নগরীর সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট দুপুর ২টা পর্যন্ত বন্ধ রাখে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন স্থানে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।
প্রসঙ্গত, এরশাদ রংপুর-৩ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। একাদশ সংসদসহ এই আসন থেকে তিনি টানা ছয়বার এমপি নির্বাচিন হন। জেলে থেকেও এই আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ৩ মার্চ রংপুরে যান অসুস্থ এরশাদ। রংপুরে নবনির্মিত বাড়ির কাজ দেখতে যান তিনি। তখন বাড়ির কাজ শেষ না হওয়ায় হোটেলে ছিলেন। নতুন বাড়িতে দুই রাত থাকার ইচ্ছায় গত ২৮ জুন রংপুরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। এর আগেই অসুস্থ হয়ে ২৬ জুন সিএমএইচে ভর্তি হন। চিকিত্সাধীন অবস্থায় রবিবার সকালে ইন্তেকাল করেন। সেই পল্লীনিবাসেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের অধিকারী এরশাদ।
আজ কুলখানি
মরহুম এইচ এম এরশাদের কুলখানি আজ বুধবার বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। এরশাদের মৃত্যুর পর কাকরাইলে জাপার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ও বনানীতে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে শোকবই খুলেছিল জাপা। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের প্রতিনিধিরা গতকালও বনানীতে এসে শোকবইতে মন্তব্য লেখেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
