খালে-বিলে মিলে বাগমারা। আর এই বাগমারার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক বিল দখল করে শুরু হয়েছে পুকুর খননের মহোৎসব। বাগমারার ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটিতে রয়েছে বিশাল আকারের বিল। আর এই বিল দখল করে বর্তমানে শুরু হয়েছে পুকুর খনন। এসব খনন কাজে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাগমারার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে কমবেশি পুকুর খনন করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি পুকুর খনন করা হচ্ছে আউসপাড়া, শুভডাঙ্গা, গনিপুর, ঝিকরা ও বিহানালী ইউনিয়নে। এসব ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশতাধিক স্পটে রাতের আঁধারে চলছে পুকুর খনন। আউসপাড়া ইউনিয়নের নিমাই বিলে একই স্টাইলে চলছে পুকুর খনন। এই বিলের চারিপাশের গ্রাম সারন্দি, কোন্দা, ধামিনকৌড়, খোদ্দকৌড়, গাঙ্গোপাড়াসহ ১০-১২টি গ্রামের শতশত কৃষকের আবাদি ধানী জমি জোরপূর্বক দখল করে তিনটি স্পটে রাতের আধারে পুকুর খনন করছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ার থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী মহল।
একইভাবে শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের নিমাই বিল এলাকার ৪-৫ টি গ্রামের প্রায় ৭০ জন কৃষকের জমি জোরপূর্বক দখল করে পুকুর খনন করছে ওই ইউনিয়নের ক্ষমতাসীন ছত্রছায়ায় থাকা জাহাঙ্গীর হোসেন, খুরশেদ আলম, আব্দুল হাকিম, আব্দুল মকিম ও সাহেব আলীসহ ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট। তারা স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও কথিত কিছু সংবাদ কর্মীকে ম্যানেজ করে রাতের আধারে খনন কাজ শুরু করেছে। এই বিলে অন্যায় ও জবর দখল করে অন্যের জমির উপর পুকুর খনন বন্ধ করার জন্য সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে গ্রামবাসীরা অভিযোগ দায়ের করেছেন।
ভুক্তভোগী জমির মালিকরা জানান, তাদেরকে না জানিয়ে রাতের আঁধারে বিলে ভেক্যু নামিয়ে পুকুর খনন শুরু করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এই প্রভাবশালী মহল কারা এমন প্রশ্নের জবাবে জমি মালিকরা জানান, তারা সবাই বিএনপির ছত্রছায়ায় থেকে স্থানীয় ভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেড়ায়। এর আগেও তারা বিএনপির পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচন করেছে। তারা বিএনপির কিছু নেতার ইন্ধনেই দেদারছে সেখানে পুকুর খনন করছে।
একই ধারাবাহিকতায় মাড়িয়া ইউনিয়নের পিদ্দপাড়া গ্রামেও চলছে পুকুর খনন। এই গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল রানা ও আমজাদ হোসেন ওরফে আমজাদ চিটার মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করে শুরু করেছে পুকুর খনন। এছাড়া গনিপুর ইউনিয়নের হাসনিপুর মৌজার চান্দেরআড়া গ্রামের রুস্তম আলী প্রায় ১২ বিঘা জমি দখল করে পুকুর খনন শুরু করেছেন। গাঙ্গোপাড়া বানোইল বাজার সংলগ্ন এলাকায় সোহেল নামে স্থানীয় এক ক্যাডার ৪০ বিঘার পুকুর খনন শুরু করেছেন। এছাড়া তাহেরপুর এলাকার জামলই গ্রামের আলম হোসেন ১০ বিঘা তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন শুরু করেছেন। অপর দিকে মোহনগঞ্জ হতে খড়খড়ি যাওয়ার পথে আনুলিয়া বিলে স্থানীয় ভুমিদস্যু রাসুর নেতৃত্বে শুরু হয়েছে ৫০ বিঘা জমির পুকুর খনন।
এসব পুকুর খননে নেই কোনো নীতিমালা বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন। খোদ বাগমারা থানার পাশেই চলছে পুকুর খনন। এখানে খাজাপাড়া এলাকার ভুমিদস্যু মনা একক নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে শুরু করেছে পুকুর খনন। বড়বিহানালী ইউনিয়নের বড়বিহানলী গ্রামের শরিফুল ও মুনছুর ভুমিদস্যু স্টাইলে শুরু করেছে পুকুর খনন। অপর দিকে ঝিকরা ইউনিয়নের আংড়ার বিলে স্থানীয় উপজেলা পর্যায়ের এক বিএনপি নেতার মালিকানা দাবী করে প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে বিশাল আকারের দুইটি পুকুর খনন শুরু হয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিগত ৫ আগস্টের পর সারা দেশের ন্যায় বাগমারাতেই সার্বিক পট পরিবর্তন হয়েছে। আগে যে হারে আওয়ামী লীগের লোকজন দেদারছে পুকুর খননের মহোৎসবে মেতে ওঠেছিল। এখন বিএনপির ছত্রছায়ায় থাকা লোকজন একই স্টাইলে একইভাবে পূর্বের ধারাবাহিকতায় শুরু করেছে পুকুর খনন।
তাদের দাবী অনুযায়ী, ব্যাপক পুকুর খনন করার জন্য সাবেক এমপি আবুল কালামকে ভ্যেকু কালাম উপাধি দিয়েছিল যেসব বিএনপি নেতা। আজ অবলীলাক্রমে তারাই ভ্যেকু কালাম স্টাইলে দেদারছে পুকুর খনন শুরু করেছে। তারাই আবার মঞ্চে ওঠে ভ্যেকু কালামকে গালিগালাজ করে। এ যেন এক আজব ব্যাপার ভয়ানক নাটকীয়তা।
এদিকে পুকুর খনন বিষয়ে জানতে চেয়ে খননকারী শুভডাঙ্গার জাহাঙ্গীর ও খুরশেদের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তারা প্রতিনিধিকে গালিগালাজ করে বলেন, যত পারেন লেখেন। আমরা টাকা দিয়ে চুক্তি করে নিয়েছি। একইভাবে গনিপুরের দুবিলা বিলে পুকুর খননকারী দেওলা গ্রামের মোশারফ হোসেন পান্না জানান, বিএনপি নেতা-কর্মীসহ চারিদিকের চাঁদাবাজদের অত্যাচারে পুকুর খনন বন্ধ রেখেছি।
বাগমারায় পুকুর খননসহ বিভিন্ন অরাজকতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী ব্যারিস্টার সালেকুজ্জামান সাগর বলেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ সকল অপকর্মের জন্য রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। বাগমারাতে স্বচ্ছ ধারার রাজনীতি আনতে হবে। এ জন্য আমূল পরিবর্তন দরকার। এছাড়া এভাবে যত্রতত্র পুকুর খননের ফলে জীববৈচিত্র ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। অচিরেই আমাদের এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এ জন্য প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, পুকুর খনন, দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ যেকোনো অপকর্মে দলের মূল দল বা অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। আমরা তারেক রহমানের নির্দেশনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল ইসলাম জানান, আমরা পুকুর খনন বন্ধ করতে ব্যাপক তৎপর রয়েছি। বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এখনও অভিযান চলমান রয়েছে। তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না পুকুর খনন। খননকারীরা রাতে এই কাজ করছে। অচিরে এটাও বন্ধ করা হবে।
