বাংলার মেলা-পার্বণ

চৌগাছায় বলু দেওয়ান ফকিরের মেলা

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:৩৪

যখন চৌগাছা গিয়ে পৌঁছাই তখন দুপুর। শহরের চৌরাস্তা মোড় থেকে একটু এগিয়ে পুল, তার আগে কয়েকটি দোকান। ঠাঠা রোদে দু-দণ্ড প্রশান্তি পেতে ঢুকে পড়লাম একটি কাঠের দোকানে। সেখানে ঘোড়া ও গরুর গাড়ির চাকা বানাচ্ছেন একজন। তাঁর নাম  বিষ্ণুপদ দে। ৪০ বছর ধরে একই কাজ করছেন তিনি। জানালেন, ছেলেরা সব অন্য পেশায় পাড়ি জমিয়েছেন। তিনি একাই এই অঞ্চলে এ কাজ করেন। বিষ্ণুপদ দে’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভ্যানে চড়লাম। উদ্দেশ্য হাজরাখানা গ্রাম। যে গ্রামে আছে বলু দেওয়ান বা বলু ফকিরের মাজার। প্রতিবছর আশ্বিন মাসের শেষ মঙ্গলবার বলু দেওয়ানের মেলা বসে সেখানে। মেলা চলে সপ্তাহব্যাপী। সেখানেই যাবো। সবুজের প্রান্তর আর দূরে বসতি এলাকা মাড়িয়ে ভ্যান গিয়ে থামলো কোলাহল পূর্ণ হাজরাখানার সামনে। চারদিকে ৪টি রাস্তা, একপাশে কপোতাক্ষ নদী। সব রাস্তাজুড়েই পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। কপোতাক্ষের পাড়ে হাতির সার্কাস দেখাচ্ছে চৌগাছার মাহুত দল। পাশেই হুজরাখানার প্রবেশপথ।

বলু ফকির সম্পর্কে দরগার খাদেমের মুখ থেকে যে অলৌকিক গল্পটা শোনা গেল,  বলু দেওয়ান ফকিরের মামার বাড়ি বকবাইনের গাছিকূলে। তিনি সেখানেই থাকতেন, আর গরু চড়াতেন। বলু দেওয়ান ছেলেবেলা এমন সব আচরণ করতেন যে, গ্রামের লোকজন তাঁকে পাগল বলে ডাকতেন। বলু ছিলেন পিতার একমাত্র সন্তান। তাঁর পিতা একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ তুমি আমাকে একটি মাত্র ছেলে দিলে, তাও দিলে পাগল!’ পিতার এমন দুঃখ প্রকাশের পরপরই তাঁর ভেতর যে অলৌকিক ক্ষমতা ছিল তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যা তাঁর জন্মস্থান যাত্রাপুরা, ধোপাদী ও এর আশেপাশের গ্রামে এখনো প্রচলিত রয়েছে। বলুর বয়স যখন ১০/১২ বছর তখন একদিন তাঁর পিতার কাছে আবদার করেন যে, সে মাঠে গরু চড়াতে যাবে। পিতা প্রথমে রাজি হতে চাননি। পরে ছেলের আবদার উপেক্ষা করতে না পেরে রাজি হন। মাঠে গিয়ে গরুগুলো অন্যের ক্ষেতের মাঝে ছেড়ে দেন। গরুগুলো মনের আনন্দে অন্যের ক্ষেতের ফসল খেতে শুরু করে। গ্রামের লোকেরা এসে তাঁর পিতার নিকট নালিশ দেয়। তাঁর পিতা তখন রাখালকে দিয়ে গরু চড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। বলু পিতার এ সিদ্ধান্তের কথা শুনে পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে গরু নিয়ে মাঠে যায় এবং পূর্বের মতো অন্যের ক্ষেতের মাঝে গরু ছেড়ে দেয়। গ্রামের লোকজন এবার তাঁর গরুগুলো খোয়াড়ে দেওয়ার জন্য ধরতে যায়। এমন সময় বলুর ইশারায় গরুগুলো বক পাখি হয়ে পার্শ্ববর্তী গাছে গিয়ে বসে। গরু কেউ দেখতে না পেয়ে তারা জানতে চাইলেন—তোমার গরু কই? বলু হাত উঁচিয়ে গাছের মাথায় দেখালেন। কিন্তু সেখানে তো কয়েকটি বক ছাড়া কিছু নেই! বলু বললো, ওগুলোই গরু। রেগে গিয়ে একজন বললেন, তুমি আমাদের সঙ্গে মসকরা করো? বলু হাত উঁচিয়ে ইশারা করতেই বকগুলো ঝাঁপিয়ে মাটিতে পড়তে পড়তে গরু হয়ে গেল। বলু সেই গরু নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কারোরই বোঝার বাকি রইলো না বলু এক মহাকামেল মানুষ।

খাদেম আলী, যিনি মাজারের দায়িত্বে আছেন, তাঁর মুখে বলু দেওয়ান ফকিরের আরো কাহিনি—

বলু যখন গর্ভে ছিলেন তখন তাঁর মা যাচ্ছিলেন পানি আনতে। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন। পেট থেকে বলু বললেন, মা, আমি তোমার সঙ্গে আছি তুমি ভয় পেও না। বলু ছোট থেকেই ছিলেন ভাবুক। জামা-কাপড় পরতেন না। মাঠের পাশের বটতলায় কাটাতেন দিনরাত। মা-মামারা জোর করে বাড়ি আনতেন, খেয়ে আবার চলে যেতেন বটতলায়। যখন তাঁর বয়স ১০ বছর তখন একবার চাঁনপাড়া গ্রামে আগুন লাগলে পুরো গ্রাম পুড়ে যায়। গ্রামের মানুষ এসে বলুর কাছে কেঁদে কেঁদে বললেন, বাবা বলু আমাদের সব পুড়ে গেছে। আমরা কী করবো? বলু বললেন, বাড়ি গিয়ে দেখেন, সব ঠিক আছে। বাড়ি গিয়ে তাঁরা দেখলেন তাঁদের কোনোকিছুই পোড়েনি। গ্রামের মানুষ আবার এলেন। তাঁরা বললেন, বাবা আমাদের ফসল সব পুড়ে গেছে। আমরা চাষবাস করবো কিভাবে? বলু বললেন, যাও তোমরা পোড়া ধান চাষ করো সেখান থেকেই ফলন পাবে দ্বিগুণ। আর ফলন ভালো হলে আমার জন্য পায়েস রান্না করে বটতলায় নিয়ে এসো। পরে ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার গ্রামের লোকজন পায়েস-খির নিয়ে হাজির হলেন।

বলু দেওয়ান ফকির মৃত্যুবরণ করেন সোমবার দিনশেষে রাত ১২টায়, মানে মঙ্গলবার। যে কারণে মঙ্গলবার বলু ফকিরের মাজারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রতিমাসের শেষ মঙ্গলবার এখানে আসর বসে। ভক্তকূল আসর মাত করেন। তবে ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার ওরশ আয়োজিত হয়। অত্র এলাকার সব ভক্ত তো বটেই, অন্য জেলার ভক্তরাও অংশগ্রহণ করেন এই ওরশে। ওরশ উপলক্ষে বসে মেলা। যার নাম বলু দেওয়ান ফকিরের মেলা বা বলুর মেলা।

কথা হলো আরেক খাদেম আরশাদ আলীর সঙ্গে। তাঁর বাবা চান্দ আলী শাহ ছিলেন মাজারের খাদেম, দাদা মোসলেম শাহও ছিলেন খাদেম। এখন তিনিও বলুর চরণেই সঁপেছেন দেহ-মন। তিনি শোনালেন বলু ফকির দেওয়ানের কেরামতির আরেক কাহিনি—

বলু মামার সঙ্গে বেগুন গাছ লাগাতে গেছেন। মামা বেগুন গাছ লাগিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। পরদিন গিয়ে দেখেন বলু সব গাছ উল্টো করে লাগিয়েছেন। মানে মাথা মাটিতে পুতে দিয়েছেন, আর শিকড় ওপরের দিকে। তবে বলুর লাগানো সব গাছে বেগুন ঝুলছে, আর তাঁর লাগানো গাছগুলো বেশিরভাগই মরে গেছে।  

পীর বলু দেওয়ান অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। লোকমুখে শোনা যায়, তিনি যা বলতেন তাই হতো। কিন্তু তাঁর জীবনকাহিনি সম্পর্কে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তার সম্পূর্ণটাই কিংবদন্তি। তিনি যাত্রাপুর গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম ছুটি বিশ্বাস। জন্মকাল সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয়দের ধারণা বলু ফকিরের ইতিহাস প্রায় ৫শ’ বছরের।

এছাড়া সাধারণের মাঝে আরো একটি কাহিনি প্রচলিত আছে বলু দেওয়ান ফকিরের নামে।

—বলু দেওয়ান ছোটবেলায় পিতৃহারা হন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা তাঁকে নিয়ে বাবার বাড়ি হাজরাখানা গ্রামে চলে আসেন। সেখানেই তিনি বড় হতে থাকেন। বলুর মামারা ছিলেন গরিব? তাই বলু অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। একদিন গৃহকর্তা মাঠে গিয়ে সরিষা মাড়াই করতে বললেন। কিন্তু বলু তা না করে সরিষার গাদায় আগুন ধরিয়ে দিলেন। সরিষা সব পুড়ে শেষ। গৃহকর্তা বলুকে মারতে গেলেন। বলু হাসতে হাসতে বললেন, অত বকাবকি না করে বাড়ি থেকে বস্তা নিয়ে আসেন। বস্তা এনে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেখা গেল গাছগুলো শুধু পুড়েছে, সব সরিষা অক্ষত আছে। এই ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দূর-দূরান্ত থেকে অগণিত মানুষ ভিড় জমাতে থাকে বলুর কাছে।

অন্য এক কাহিনিতে আছে গ্রামের এক লোক খেজুরের রস চুলায় জ্বাল দিচ্ছিল। এমন সময় বলু সেখানে যায়। বলু আসার পর লোকটি তাঁকে চুলায় একটু জ্বাল দিয়ে দিতে বলেন। তারপর ওই ব্যক্তি জ্বালানি আনতে পাশে কোথাও যায়। জ্বালানি নিয়ে আসার পর দেখে যে, বলু চুলার আগুনের মাঝে পা ঢুকিয়ে বসে আছেন। চুলা জ্বলছে দাঊদাঊ করে। নিকটে আসতেই বলু তাঁর পা বের করে নেন। লোকটি তখন বলুর পা পরীক্ষা করে দেখেন পায়ের কিছুই হয়নি। এ ধরনের অসংখ্য কাহিনি আছে বলু দেওয়ান ফকিরের অলৌকিক ক্ষমতার।

চারদিকে এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়ল। দেশ-দেশান্তর থেকে লোকের সমাগম হতে লাগলো। এ সময় তিনি তাঁর জন্মভূমি যাত্রাপুর ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা তাঁকে যেতে দিলেন না। গ্রামের কোনো একটি স্থানে তাঁর একটি আস্তানা তৈরি করে দিলেন। বলু কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন। তারপর স্থান ত্যাগ করে অন্যদিকে চলে যান।

এই কিংবদন্তির ওপর ভিত্তি করে যাত্রাপুর, ধোপাদী প্রভৃতি গ্রামের লোকশিল্পীরা একটি গান রচনা করেছেন। দলবেঁধে এলাকার লোকশিল্পীরা বাড়ি বাড়ি এই গান গেয়ে বেড়ান। গ্রাম্য ভাষায় এ গানের নাম ফোলই গান।

 ‘ছুটি বিশ্বাস বলে আল্লা কপালেতে ছিল,

একটা ছেলে দিলে বাবা পাগল কেন হলো।

ঐ কথা শুনে বলু নড়ি (লাঠি) হাতে নেয়,

নড়ি হাতে নিয়ে বলু গরু রাখতে যায়।

গরু রাখতে যায় বলু ব্যাদন বিলের মাঠে,

গরু রাখতে যেয়ে বলু মাঠের ধানও খাওয়াই।’

তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ হলে পিতার অনুরোধে কিছুদিন যাত্রাপুর অবস্থান করেন। পরে ধোপাদী গ্রামে কিছুদিন ছিলেন। বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তকূলের ভিড় বাড়তে থাকে। তিনি বশির শাহ নামক একজনকে দীক্ষা দেন। বশির শাহ ও বলু দেওয়ানের মতো ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। বলু ফকির মুক্তদাহ, যশোর, ভেন্নাবেড়ে ও ভারতের পশ্চিম বাংলায় আসন নেন। এসব স্থানে এখনো তাঁর দরগা রয়েছে। সর্বশেষ বলু দেওয়ান তাঁর মামার বাড়ির গ্রাম হাজরাখানায় এসে আসন নেন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রাম। নদীর পাড়ে উঁচু ঢিবি। তার ওপর এ অঞ্চলের বিখ্যাত পীর বলু দেওয়ানের মাজার। স্থানীয়রা এটাকে ‘রওজা শরীফ’ বলে চেনেন। সেখানে আছে আম, কাঁঠাল গাছ আর বাঁশ ঝাড়। এরইমাঝে ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবারে বসে মেলা। তবে মাজারের অন্যতম আকর্ষণ দ্রব্য শম্ভার। বাইরের অংশকে দিশের বাজার বলে চেনেন এলাকাবাসী। দেশ-দেশান্তর থেকে হাজির হন ফেরিওয়ালা, দোকানিরা। 

হাজরাখানা ও এর পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন মেলা উপলক্ষে তাঁদের মেয়ে জামাইকে দাওয়াত করেন, নতুন পোশাক উপহার দেন। ঈদের সময় মেয়ে জামাই না এলেও মেলা উপলক্ষে অবশ্যই আসতে হবে। এই মেলার একটি বিস্ময়কর দিক হলো প্রতিবছর মেলার দিন বৃষ্টি হবেই। এর কোনোরকম ব্যতিক্রম ঘটেনি এ পর্যন্ত। গ্রামের লোকজন বিশ্বাস করেন, পীরের উছিলায় এ গ্রামে কোনো বড় রকমের মহামারি হয় না।