শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কবিতা

যুদ্ধ বিরোধী মারণাস্ত্র এক

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ২১:৪০

"এক পৃথিবীর হৃৎস্পন্দন-
হৃদয়  নীড়ের বিস্ফোরিত-
বর্ণ শব্দ বাক্যের কলতান
একসাথে এসে দাঁড়ায় যদি
নিশ্চিত জেনো চিহ্ন হারাবে
বলশালী যত আনবিক বোমা
ইসরায়েলের কালো হাত- দাবানল। "

কবিতা - তা সে হোকনা জ্বলন্ত বারুদ অথবা বিনম্র গোধূলির ছায়া -এক অবিনশ্বর শান্তির নাম।পূর্নাঙ্গ মানবসত্তার এক কাব্যিক প্রকাশন, এতটাই কল্যাণকামী যে তা নিমেষেই রোধ করতে পারে সব চাইতে ধ্বংসাত্মক ও শক্তিশালী যুদ্ধকে।

সভ্যতার সোনালী বুকে সভ্যতানাশী যুদ্ধ -ধ্বংসের মরন ছোবল হেনে বারবার বিঘ্নিত করেছে অগ্রযাত্রা- কেড়ে নিয়েছে লক্ষ কোটি প্রাণ।সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতা তার আগ্রাসী মারণাস্ত্রে পৃথিবীকে এক জ্বলন্ত বারুদ করেছে। যুদ্ধাহত এই পৃথিবী রক্তাক্ত  - ক্লান্ত। মিথ্যা গনতন্ত্র প্রতিষ্টার আশ্বাসে মানবতার দাবি নিয়ে তথাকথিত মানবতার ফেরিওয়ালারা একের পর এক ধ্বংস করে চলেছে হাজার বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য মন্ডিত শত সহস্র জনপদ। নিত্য নতুন মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগীতায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো। ঠিক তখনই মানবতাবিরোধী ইসরায়েলের ধ্বংসলীলায় ফিলিস্তিনী শিশুদের গগন বিদারী আর্তনাদে বারুদের মত জ্বলে উঠেছে কবিতা। যুদ্ধ বিরোধী প্রবল পরাক্রমশালী মারণাস্ত্র হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে কবিতাই।শক্তিধর কলমযোদ্ধা কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা তার দীপ্ত উচ্চারণে গর্জে উঠেন-

"ফিলিস্তিন ফিলিস্তিন
অদম্য স্বাধীন
হায়েনা ইহুদিবাদের 
শেষ হবে দিন --"

অথবা মহাদেব সাহার  অমর কাব্য কথন--
"এখানে কারফিউ ঘেরা রাতে
নিষিদ্ধ পূর্ণিমা-
আজ গানের বদলে মুহুর্মুহু
মেশিন গানের শব্দ
বুঝি কোথাও ফুলের কোন অস্তিত্ব নাই--"

হৃদয় নিংড়ানো দীর্ঘশ্বাসে পূর্নেন্দু পত্রী লিখেছেন যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ  নিয়ে কবিতা--

"অনেক বছর পরে তোর কাছে
এসেছি মল্লিকা
তোর পাশে চাঁপা ছিল
টগর ঝুমকো জবা ছিল
তারা কই? মারা গেছে? 
এত মৃত্যু ঘটে গেল একাত্তর বাহাত্তর তিয়াত্তর সালে--"

কিশোর কবি সুকান্তও মন প্রান থেকে ঘৃনা করতেন যুদ্ধকে-- পরাধীনতাকে--

"ছিঁড়ি গোলামীর দলিলকে ছিঁড়ি
খুঁজি কোনখানে স্বর্গের সিঁড়ি
কোথায় প্রান।"

কবি আবুল হাই শিকদারের কবিতায় ঘৃনা হয়ে ঝরে পরেছে যুদ্ধ বিরোধী চিৎকার -

"ইহুদী বুলডোজারে আকছার যে মিনার নেই,
বারুদের পাহাড়ের নিচে
 যে যুবক চাপা পড়ে গেল
সে আমার ভাই-"

কি প্রজ্জ্বলিত ক্ষেপণাস্ত্রে গর্জে ওঠা কবিতা।তীব্র শক্তিধর এই কবিতাগুলোর চেয়ে যুদ্ধ বিরোধী অন্য কোন অস্ত্রের নাম আমার জানা নেই।

কখনো বা কবিতা পাঠে মৃত্যুর আঘাতে অন্তিম শয়নে শায়িত  সহযোদ্ধার জন্য কেঁপে ওঠে বুক---
"If I die in a war zone
Box me up and 
send me home.
Put my medals on my chest
Tell my mom I did my best---"
কবিতার তীব্র অনুভূতিতে মন প্রান ভরে যুদ্ধ বিরোধী বোমা হয়ে যুদ্ধের মাঠে যেন আছড়ে পড়ি নিজেই।

আশির দশকের কবি তমিজ উদ্দিন লোদীর কবিতায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে কি অটল প্রতিবাদ--
"এই বারান্দায় আর কোন 
রোদ আসবে না
কারণ বারান্দাটি নেই।
এই ছাদ আর কোনো ছায়া হবে না
কারণ ছাদটিও নেই---"

যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী কাব্যিক উচ্চারণ --

"নাগিনীরা চারদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, 
শান্তির ললিত বানী শোনাইবে
ব্যর্থ পরিহাস-"
কবিতার বিনম্র প্রার্থনায় মহাশক্তিধর এক যুদ্ধ বিরোধী আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণ করেছেন বিশ্বকবি।
কুসুম কুমারী দাস তার মনুষ্যত্ব কবিতায় যুদ্ধের প্রতি প্রবল আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন-
"মনুষ্যত্ব জাগাইলে 
পাইব উদ্ধার 
যত অপমান লাঞ্চনা পীড়ন
একতার বলে সব 
হইবে সমান---"

আর ভূপেন হাজারিকার সেই জগত খ্যাত কাব্যকথা - যা পরিপূর্ণ সংগীত সম্ভারের অবিনশ্বর প্রভা, কি স্পষ্ট প্রত্যয়ে যুদ্ধ বিরতির কথা বলে--
"মানুষ যদি সে না হয় মানুষ 
দানব কখনো হয় না মানুষ 
যদি দানব কখনো বা 
হয়ও মানব
লজ্জা কি তুমি পাবে না-"

জীবনকে ভালবেসে জীবন সাজায় কবিতা।ফুল ফোটা বসন্তে জীবনের পতাকা ওড়ায়। মোহাম্মদ রফির যুদ্ধ বিরোধী গানেও আমরা সেই আকুতি খুঁজে পাই--

"না না না
পাখিটার বুকে যেন 
তীর মেরোনা
ওকে গাইতে দাও---"
কঠিন যুদ্ধংদেহী হৃদয়েও যুদ্ধ বিরতির স্বেত পতাকা ওড়াবে গানরুপী এই কবিতা। 

কবিতা সুদীপ্ত মানবতার, কবিতা চিরশান্তির উদ্ভাসিত অঙ্গীকার।
মানব সভ্যতার শুরু হতেই হৃদপিন্ডের পবিত্র রক্ত কণার মত সদা বহমান কবিতা মানুষ ও পৃথিবীর যে কোন বিপর্যয়ে শক্তিময় স্বজন বন্ধুর মত পাশে থেকেছে, মুক্তির পথ দেখিয়েছে, বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে। কবিতা মুক্তির গান,মিছিলর শ্লোগান,  নির্জীব দেয়ালে উন্মুখ চেয়ে থাকা প্রাণময় লেখনি। কবিতা বীরের, কবিতা শান্তি যোদ্ধার, কবিতা স্বদেশ প্রেমীর। কবিতা চির অমলিন শান্তি সুরভিত এক জয়যাত্রার নাম।  জাতি,ধর্ম,বর্ণ,মানচিত্র নির্বিশেষে কবিতা সারা পৃথিবীর - সব মানুষের। কবিতা আত্মিক শুদ্ধিকরণ ও জাগরণের, কবিতা চির শান্তির চির উন্নয়নের।কবিতা সূর্যরং সকাল,ডানা মেলা রোদ,সুরভিত জোছনা।কল্যাণমুখর জীবনের আত্মিক আয়োজন কবিতা - বারবার সহস্র কোটিবার বলুক যুদ্ধ বিরোধী কলতান।

লেখক- ডাঃ প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ), কবি ও কথাসাহিত্যিক,  কলামিস্ট, প্রবন্ধকার,গবেষক ও গিটারিস্ট।

ইত্তেফাক/এএইচপি