আন্তর্জাতিক নদীরক্ষা দিবস আজ

দেশের বেশিরভাগ নদী রুগ্ন অবস্থায় বেঁচে আছে

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৫, ১২:২০

দেশের কোনো নদীই আজ ভালো নেই। নদীমাতৃক এই দেশের নদীগুলো দখল আর দূষণে বিপর্যস্ত। দেশব্যাপী জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো স্বাস্থ্য শোচনীয়। বেশিরভাগ নদী শুকিয়ে রুগ্ন অবস্থায় কোনো মতে বেঁচে আছে। দখল-দূষণ বন্ধ করে বাঁচাতে হবে নদীকে।

গত দুই দশকে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যের প্রসারের ফলে নদীর দখল ও দূষণ বেড়েছে ব্যাপক হারে। নদীর অবৈধ দখল ও পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে আছে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন। নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখা, দূষণমুক্ত রাখা এবং দখল রোধে জড়িত আছে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। তার পরেও রক্ষা পাচ্ছে না নদীগুলো। শিল্পকারখানার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। উজান থেকে নেমে আসা পলি এসে পড়ছে নদীতে। ময়লা-আবর্জনার কারণে একদিকে যেমন জলজপ্রাণী হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

নদী গবেষক ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপার মো. নূর আলম শেখ গতকাল নদী দিবসের এক সভায় বলেছেন, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের ১০০৮টি নদীর হিসাব পূর্ণাঙ্গ নয়। শুধু সুন্দরবনের ভেতরেই আছে প্রায় ৪০০ খাল-নদী। সুন্দরবনে নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে আর সেই সঙ্গে হত্যা করা হচ্ছে জলজপ্রাণীগুলোকেও। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করছে পশুর নদ আর সুন্দরবনকেও। সেখানকার কৃষক ও জেলেরা জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের দাবিতে। তাদের পক্ষ থেকে আমিও পশুর নদ ও সুন্দরবন রক্ষায় রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের দাবি জানাই।

খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নদীর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি, কিন্তু আজ আমাদের নদীর কোনো স্বাধীনতা নাই। হাওড় এলাকার শিল্পের সকল বর্জ্য নদীর পানিতে এসে পড়ছে। পানি আর পানি নাই, হয়েছে ময়লার স্তর। নদী আর নদী নাই, কোনটা মরে গেছে আর কোনটা কোনোমতে বেঁচে রয়েছে মৃতপ্রায় খাল হয়ে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার আটটি। বাংলাদেশে শাখা-প্রশাখা উপনদী মিলে কম-বেশি ৭০০টি নদী রয়েছে। তবে দেশের শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্তত ২৮টি নদ-নদী দখল আর দূষণের শিকার হয়ে এখন মৃতপ্রায়। ৫৩ জেলার নদী ও খালের বিভিন্ন অংশ দখল করেছে ১০ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। তবে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের মতে, নদী দখলদারদের সংখ্যা আরও বেশি।

এমন পরিস্থিতিতে-আজ ১৪ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদী সুরক্ষা দিবস-২০২৫। নদীর প্রতি মানুষের করণীয়, দায়িত্ব এবং মানুষের দায়বদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হবে। ১৯৯৮ সাল থেকে সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালের মার্চে ব্রাজিলের কুরিতিয়া শহরে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ থেকে আন্তর্জাতিক নদীরক্ষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

আসলে সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নদীর ধারে গড়ে উঠেছে বড় বড় কলকারখানা, নদীতে শত শত বাঁধ। যখন যেভাবে প্রয়োজন তখন সেভাবে নদীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রভাবশালীরা নদী ভরাট করে দখল করার উৎসবে মেতে উঠেছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ এখন নদী বৈরীর দেশে পরিণত হয়েছে।

রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের ভেতরের ও আশপাশের নদী-খালগুলোর দখল এবং দূষণের বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এ অশুভ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দেশের সব নদী, বিল ও খালগুলোর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং দূষণবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি উচ্ছেদ অভিযানের পর আবারও যাতে দখলের প্রক্রিয়া শুরু না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দখলদাররা এতটাই বেপরোয়া যে, তারা নদী তীরের সীমানা পিলার পর্যন্ত উপড়ে ফেলে দেয়।

নদী গবেষকরা বলছেন, শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্তত ২৮টি নদনদী দখল আর দূষণের শিকার হয়ে এখন মৃতপ্রায়। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর বেহাল দশা। আবর্জনা আর বর্জ্যের কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। দেশের প্রধান নদীগুলোর প্রায় একই অবস্থা। বাঙ্গালি, ধলেশ্বরী, বালু, ব্রহ্মপুত্র, লৌহজং, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, কীর্তনখোলাসহ অনেক নদী নাব্য সংকটে পড়েছে। টাঙ্গাইলের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বংশাই নদী বর্তমানে সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। একই রকম অবস্থা হয়েছে বগুড়ার করতোয়া নদীর। এভাবে চলতে থাকলে ভয়াবহ পানি সংকটে পড়বে দেশ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইত্তেফাক/এসএএস