অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই ইতিবাচক ধারায় প্রবহমান রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রধান দুটি খাত পণ্য রফতানি এবং জনশক্তি রফতানি খাত অত্যন্ত চাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রফতানি খাতে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল তা ইতিমধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে এবং খাতটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর (২০১৮-১৯) সমাপ্ত অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ ১ হাজার ৬৪২ কোটি মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। রেমিটেন্স আহরণের ক্ষেত্রে এটি একটি রেকর্ড। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১ হাজার ৫০০ কোটি ৩২ লাখ মার্কিন ডলার রেমিটেন্স আহরণ করেছিল। এর মধ্যে শুধু মে মাসেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার রেমিটেন্স প্রেরণ করেছে। মাসের হিসেবে যেটি একটি রেকর্ড। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে রাজনৈতিক-সামাজিক নানা সমস্যা, নির্মাণ তথা উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে জনশক্তি রপ্তানি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া আগে থেকে যারা এসব দেশে কাজ করছিল তাদের অনেকেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। যারা এসব দেশে অবস্থান করছেন তাদের বেতন-ভাতাও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় জনশক্তি রপ্তানি খাতটি ঝুঁকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান দুটি খাত হচ্ছে পণ্য ও সেবা রপ্তানি এবং জনশক্তি রপ্তানি।
বাংলাদেশ নানা কারণেই জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। স্বল্পোন্নত ৪৮টি দেশের মধ্যে জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয়। বাংলাদেশ প্রতিবছর জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে যে রেমিটেন্স আয় করে প্রকৃত অর্জন তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছেন যাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বৈধভাবে দেশে প্রেরণ করেন। পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স না পাঠিয়ে হুন্ডি বা অন্যান্য নানা পদ্ধতিতে রেমিটেন্স প্রেরণ করে থাকেন। আগামী অর্থ বছরের জন্য যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিটেন্সের ওপর ইনসেনটিভ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এতে আগামীতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধপথে রেমিটেন্স প্রেরণে উত্সাহিত হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতটি এখনো কার্যত ব্যক্তিমালিকানাধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এই খাতটি নানা ধরনের অনিয়ম আর প্রতারণার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার মালয়েশিয়ার সঙ্গে জি-টু-জি(গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। জি-টু-জি পদ্ধতির সুবিধা হলো এতে অত্যন্ত স্বল্প খরচে বিদেশে গমন করা যায়। প্রতারিত হবার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সম্ভাবনা অন্য যে কোনো খাতের চেয়ে বেশি। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এই খাতের সম্ভাবনাকে ব্যবহার করতে না পারার কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উপকৃত হতে পারছি না। জনশক্তি রপ্তানি খাতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে, যা ইচ্ছে করলেই সমাধান করে এ খাতের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম সীমিত সংখ্যক দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। বিশেষ করে এই খাতটি মধ্যপ্রাচ্যের ৮টি দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলতে হয় বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতটি অনেকটাই সৌদি আরব নির্ভর। প্রতি বছর যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশি কর্মসংস্থান করছে তাদের ৯০ শতাংশই যাচ্ছে সৌদি আরবে। যেমন-২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১০ লাখ ৮ হাজার ৫২৫ জন কর্মসংস্থান উপলক্ষে বিদেশে গমন করে। এদের মধ্যে ৫ লাখ ৫২ হাজার ৩০৮ জনই সৌদি আরবে যায়। সৌদি আরবে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জনশক্তি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। ২০১৮ সালে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যান্য দেশে জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম গতিশীল হবার কারণে ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে বাংলাদেশ জনশক্তি খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স আয় করতে সমর্থ হয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি খাতের সম্ভাবনাকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাতে হলে আমাদের এখনই মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি অন্যান্য উন্নত দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশে অধিক সংখ্যায় জনশক্তি রপ্তানির প্রতি মনোযোগী হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর প্রতি আমাদের এক ধরনের ধর্মীয় আবেগ রয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় আবেগ দিয়ে বাণিজ্য চলে না। বাণিজ্য চলে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির একটি চমত্কার গন্তব্য হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনশক্তি রপ্তানির জন্য কতটা সম্ভাবনাময় তা একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝানো যেতে পারে। সার্বিকভাবে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি করে আমরা তার ধারে কাছেও নেই।
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের একটি বড়ো সমস্যা হলো প্রশিক্ষিত এবং পেশাজীবীদের বিদেশি প্রেরণ করতে না পারা। বাংলাদেশ থেকে যারা কর্মসংস্থান উপলক্ষ্যে বিদেশে গমন করেন তাদের অধিকাংশই অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক। তারা মাতৃভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষা জানেন না। ফলে বিদেশে গিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হন। বাংলাদেশ থেকে যারা কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গমন করেন তাদের মধ্যে পেশাজীবীর সংখ্যা পাঁচ শতাংশও নয়। অথচ বিদেশে পেশাজীবীদের ব্যাপক চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। ৮০-র দশকে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে জনসংখ্যা পরিকল্পিতই হোক আর অপরিকল্পিতই হোক, তা কখনোই এক জাতীয় সমস্যা নয়। জনসংখ্যা এমনই এক অর্থনৈতিক উপকরণ যা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে পারলে জাতির অন্যতম সম্পদে পরিণত হতে পারে। আর কোনো কারণে এই সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে তা ‘দায়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করছে। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ যদি কর্মক্ষম থাকে সেই অবস্থাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বলা হয়। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন একটি জাতির জীবনে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থা একবারই আসে। যে জাতি সেই অবস্থার সুফল কাজে লাগাতে পারে না তারা অর্থনৈতিকভাবে কখনোই উন্নতি করতে পারে না। বাংলাদেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অবস্থা ২০৩০/২০৩২ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তাই আমাদের এই সময়ের মধ্যে জাতিকে উন্নত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের সম্ভাবনাকে আরো ভালোভাবে কাজে লাগাতে হলে বিদেশে প্রেরণের পূর্বে একজন কর্মীকে ট্রেড ভিত্তিক উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণ শিক্ষার পরিবর্তে সমাজে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। যাতে তারা চাকরির উপর নির্ভর না করে নিজেরাই আত্ম কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে নিতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটে মোট জিডিপির অন্তত ছয় শতাংশ বরাদ্দ রাখার কথা। কিন্তু আমাদের এখানে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ জিডিপির দুই শতাংশের মতো। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জাতিকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। প্রচলিত উচ্চশিক্ষার নামে বেকার তৈরির শিক্ষা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
n লেখক: অর্থনীতি বিষয়ক কলাম লেখক
