প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণে দেশের জলাশয়গুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি-আমাদের যত জলাশয়, পুকুর, খাল, বিল রয়েছে সেগুলোকে আমরা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনব। যাতে মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধি পায়। বাড়ির আশপাশের ডোবা, পুকুর ও জলাশয় ফেলে না রেখে মাছ চাষ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেছি। এখন দৃষ্টি পুষ্টির দিকে। বিল, ঝিল, হাওর-বাঁওড়, নদী নালায় পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করতে হবে। মাছের চাইতে নিরাপদ আমিষ আর নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে (কেআইবি) জাতীয় মত্স্য সপ্তাহ উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
তার সরকারের শতবর্ষ মেয়াদি ডেল্টা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশে আমরা নদীগুলোকে ড্রেজিং করছি, যাতে এর প্রবাহ এবং নাব্য বৃদ্ধি পায়। আর পানির প্রবাহ বাড়লে মাছের উত্পাদন বাড়বে এবং একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যে কোনো দুর্যোগের মোকাবিলা আরো সহজ হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা গণভবনের লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পোনা মাছ ছেড়ে মত্স্য সম্পদ উন্নয়ন অভিযানের সূচনা করেন। তিনি সে সময়ই পাট, চামড়া, চা-এর সঙ্গে মাছকেও বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তার সরকার জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসৃজন, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলমহালে প্রকৃৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন জলমহাল নীতিমালা, জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘হ্যাচারি আইন ও বিধিমালা, মত্স্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ও বিধিমালা প্রণয়নসহ অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। চিংড়ি প্ল্যান্ট ইজারা নীতিমালা, মত্স্য সঙ্গনিরোধ আইন ও জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জাল যার জলা তার’ আমরা এর ভিত্তিতে জেলেদের বিভিন্ন জলাশয় বরাদ্দ দিচ্ছি। উত্পাদন বাড়ানোর জন্য আমরা বাগেরহাটে চিংড়ি গবেষণা, চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি। যেন মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পায়, সেজন্য হাওরে পরিকল্পিতভাবে মত্স্য চাষের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার ১১ শতাংশের বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মত্স্য সম্পদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। প্রাণিজ আমিষের চাহিদার শতকরা ৬০ ভাগ জোগান দেয় মত্স্য খাত। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সমস্যা সমাধানের কারণে বিশাল সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার উল্লেখ করে তার সরকারের ব্লু-ইকোনমি সম্প্রসারণের উদ্যোগও তুলে ধরেন। প্রাকৃতিক উত্স রক্ষায় তার সরকার সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ও বনাঞ্চল রক্ষা, পানিসম্পদের উন্নয়ন ও নদীতে নাব্য রক্ষার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মধুমতি, গড়াই, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে নাব্য পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, মধুমতি ও গড়াই নদী খননের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা হ্রাস পেয়ে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সুন্দরবন এবং আশপাশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আসন্ন ঈদে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় পশু কোরবানি করে এর চামড়া, হাড় এমনকি রক্ত—যেগুলো বিভিন্ন কাজে লাগে সেগুলোর সংগ্রহ নিশ্চিত করা যায় কি না সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণেও মত্স্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে মত্স্য চাষ, রেণু উত্পাদনসহ মত্স্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জাতীয় মত্স্য পুরস্কার ২০১৯ প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। পুরস্কার হিসেবে ৮ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে স্বর্ণ পদক ও ৫০ হাজার টাকার করে চেক এবং ৯ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে রৌপ্য পদক ও ৩০ হাজার টাকার করে চেক প্রদান করা হয়। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রইসুল আলম মণ্ডল, মত্স্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সাইদ মোহম্মদ রাশিদুল হক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ‘মাছ চাষে গড়ব দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্লোগান নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। পরে প্রধানমন্ত্রী কেআইবি প্রাঙ্গণে সপ্তাহব্যাপী জাতীয় ‘মত্স্য মেলা’র উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল জাতীয় মত্স্য সপ্তাহ উদযাপন উপলক্ষ্যে গণভবন লেকে মাছের পোনাও অবমুক্ত করেন।
