আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র চিকিৎসকের অভাবে যেন রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকের পদ এবং পদায়িত চিকিৎসক থাকলেও তারা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংযুক্ত থাকায় কেন্দ্রগুলো চিকিৎসক শূন্য হয়ে পড়েছে। এতে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে আগত রোগীরা চিকিৎসা ছাড়াই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দিচ্ছেন ফার্মাসিস্ট। চিকিৎসকসহ অন্যসব পদ শূন্য থাকায় কালাপাহাড়িয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে।
এদিকে বাস্তবে না থাকলেও কাগজে কলমে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সাতটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অস্তিত্ব রয়েছে। সেখানে চিকিৎসকও পদায়িত আছেন। কিন্তু তারা ডিউটি করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আরো জানা গেছে, পাঁচটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সাতটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মোট ১২ জন চিকিৎসক উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংযুক্ত থাকলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ঐ চিকিৎসকরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না। সপ্তাহের বেশির ভাগ সময়ই তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাওয়া যায় না। এরমধ্যে সাতগ্রাম উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. রাইয়ানা আক্তার শিয়ন ও সদাসদি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন (নতুন সৃষ্ট পদ) ডা. তানজিয়া সোবহান শিলা ছুটি ছাড়াই বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঐ দুই চিকিৎসক বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এরপরেও তাদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পুরো উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। সরেজমিনে ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এসব অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।
সাতগ্রাম উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র : সাতগ্রাম উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. রাইয়ানা আক্তার শিয়ন (কোড নং ১৩৯৬৬২) ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল যোগদান করলেও ২০২২ সাল থেকে ছুটি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। বর্তমানে এক জন মিডওয়াইফ ও ফার্মাসিস্ট দিয়ে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কার্যক্রম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।
ব্রাহ্মন্দী উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র : ব্রাহ্মন্দী উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. আব্দুস সালাম ২০১৭ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালে সংযুক্তি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া এখানকার উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারকেও চৈতারকান্দা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে পুরো স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বর্তমানে এক জন ফার্মাসিস্ট ও এক জন মিডওয়াইফ দিয়ে চলছে। এতে রোগীরা ভালো চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
হাইজাদী উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র : হাইজাদী উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসারকেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এখানে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার ও অফিস সহায়ক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে শুধু এক জন ফার্মাসিস্ট দিয়ে পুরো কেন্দ্রটি চালানো হচ্ছে।
চৈতনকান্দা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র চৈতনকান্দা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. ইশরাত করীম কেকাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়ক না থাকায় শুধু এক জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে কোনো রকমে স্বাস্থ্যসেবা চালানো হচ্ছে।
কালাপাহাড়িয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র: কালাপাহাড়িয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. সুরাইয়া শারমিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংযুক্ত থাকায় তিনি এখানে সময় দেন না। দীর্ঘদিন ধরে এই কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে এবং এটি কিছুদিন পুলিশ ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কেন্দ্রের এক জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার আট বছর ধরে ঢাকায় সংযুক্তি অবস্থায় রয়েছেন। ফলে কার্যত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কোনো কাজেই আসছে না। স্থানীয় জনগণ চিকিৎসাসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিকের কয়েক জন স্বাস্থ্য সহকারীকে দিয়ে সপ্তাহে দুই দিন স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে শুধু রোগীদের ওষুধপত্র দেওয়ার জন্য।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, সাতটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো অস্তিত্ব না থাকায় ঐসব ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়িত চিকিৎসকরা বর্তমানে আড়াইহাজার উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও তাদের অধিকাংশকেই সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি পাওয়া যায় না। চিকিৎসকরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে সপ্তাহে দুই-তিন দিন হাসপাতালে আসেন। ফলে পুরো উপজেলার চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া জানান, অধিদপ্তরের নির্দেশে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা উপজেলায় সংযুক্ত আছেন। আর দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত থাকা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
