স্বপ্ন দেখি দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ 

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৫, ০৬:০০

১৯৭১ সালের এই মার্চ মাসেই আমরা আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল এ দেশের নিরীহ মানুষকে। বহু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, দালানকোঠা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করেছিল। আমাদের অপরাধ ছিল একটাই, তা হলো-আমাদের ন্যায্য অধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে চাওয়া। এ দেশের আপামর জনসাধারণ চেয়েছিল একটা স্বাধীন দেশ, যেখানে থাকবে না কোনো শোষণ বঞ্চনা কিংবা বৈষম্য। থাকবে জীবনের নিরাপত্তা। কিন্তু সে স্বাধীনতা কখনো আসেনি। শ্রেণিবৈষম্য দূর হওয়া তো দূরের কথা, দিনে দিনে আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী যতগুলো সরকার এসেছে, সব সরকারের আমলেই কমবেশি দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশিত হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতির উপাখ্যান প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশবাসীর অজানা নয়। এরপরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত একটি রাজনৈতিক দল দায়িত্বগ্রহণ করলে মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু ভাগ্য আমাদের সুপ্রসন্ন নয়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। বিগত সরকারের মন্ত্রী এমপি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা, সর্বনিম্নস্তরের কর্মচারী, দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের যে খতিয়ান পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হচ্ছে, তা দেখে এ দেশের মানুষ হতবাক। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার। দেশের ব্যাংক বিমা খালি করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। দেশের উন্নয়নে পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় হয় না, কিন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে কর কমিশনারদের অবৈধ পথে উপার্জিত অগাধ সম্পদের খতিয়ান পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে ওঠেনি। আর তাই আজও শাসন, শোষণ, বৈষম্য, বঞ্চনার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয় এ জাতিকে। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের ইতিহাসও বদলে যায়। নীতি-নৈতিকতাবিহীন রাজনীতির বিষবাষ্প আমাদের সামগ্রিক জীবনকে করছে কলুষিত। কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। গণতন্ত্রের প্রথম কথাই হলো মতপ্রকাশের অধিকার বা স্বাধীনতা। রাজনীতিবিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে এ দেশের সচেতন মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করলে তাদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার নির্যাতন। মানুষ ধরেই নিয়েছে, যারা রাজনীতিতে আসেন, তারা তাদের আখের গোছাতে আসেন। এসব কারণে দেশের মানুষ রাজনীতি তথা রাজনীতিবিদদের ওপর বীতশ্রদ্ধ, সেই সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত।

বিরোধী দলে যারা থাকেন, তারা জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা না বলে, বছরের পর বছর সংসদে না গিয়েও শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি ব্যবহার এবং বেতনভাতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে কোনো দ্বিধা বা সংকোচবোধ করেন না। বিগত সরকারের দীর্ঘ সময়ে উন্নয়নের স্রোতে দেশবাসী ভেসেছেন। আমরা এ দেশের সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের সুবাদে যেসব তথ্য উপাত্তসহ উন্নয়নের চিত্র পেয়েছি, তাতে দেশ নিয়ে আশার আলো দেখেছি। গর্বিত হয়েছি। উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠার কথা শুনলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির কথা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হলেও সেসব বিষয়ে সরকারের উচ্চমহল থেকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। শুধু শুনেছি 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা'।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এতদিন ধরে উন্নয়নের যে তথ্য উপাত্ত সরবরাহ করা হয়েছিল, তা যে কতটা ভুল ও ভিত্তিহীন ছিল, তা এ দেশের মানুষসহ বিশ্ববাসী দেখছেন। শুধু দুর্নীতিই নয়, সামাজিক অবস্থাসহ শিক্ষার পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি দলবাজি ছাত্রসমাজকে কলুষিত করেছে। অথচ এ দেশের ছাত্রসমাজ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচনসহ '৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে কলুষিত হয়ে আছে দেশ। আমাদের জীবন থেকে ন্যায় অন্যায়, শৃঙ্খলাবোধ, দেশাত্মবোধসহ মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলো যখন প্রায় লোপ পেতে বসেছিল, তখন নতুন প্রজন্মের এ সন্তানরা, দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধারসহ ছাত্রজনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রমাণ করে দিতে এগিয়ে এসেছে। দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে প্রয়োজনে তারা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, পারে গোষ্ঠী স্বার্থের উর্ধ্বে ওঠে নিজেদের আরাম আয়েশ হারাম করে খোলা আকাশের নিচে রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেছে রাজপথ।

তাদের উদ্যোগ উদ্দমের সঙ্গে সাড়া দিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে স্বাধীনতাকামী বঞ্চিত মানুষ। এদের ত্যাগের মহিমায় গর্ব অনুভব করেছি। আমাদের জমানো/পুঞ্জীভূত হতাশা আর ক্ষোভ স্তিমিত হয়ে দেখা দিয়েছিল আশার আলো। বিশাল এ জনশক্তির কাছে অপশক্তি পরাজিত হবেই, যেমন করে পরাজিত হয়েছিল একাত্তরে। অনেক সম্ভাবনার দেশ এই বাংলাদেশ। আমাদের এ প্রজন্মের সন্তানরাই একদিন এ দেশের হাল ধরবে। সমস্ত লোভ-লালসা দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত হয়ে এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম দেবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো ইতিমধ্যে তাদের কিছু কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড মানুষকে আশাহত করছে। এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। স্বার্থপরতার পরাকাষ্ঠা থেকে দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে তাদের গড়তে হবে একটা শোষণ ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ। 
• লেখক: সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন