যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় কুরস্কের মানুষ 

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৫, ১৩:৩০

গত আগস্ট রুশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে কুরস্ক অঞ্চলে হামলা চালায় ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো বিদেশি শক্তি রুশ ভূখণ্ডে আগ্রাসন শুরু করে। নজিরবিহীন কুরস্ক অভিযান শুরু হওয়ার সাত মাসে ধীরে ধীরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর শেষ সদস্যদেরও নিজ ভূখণ্ড থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে রুশ সেনারা। তবে কুরস্কের অধিবাসীরা দ্রুতই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না। যদিও তারা দ্রুতই যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এদিকে রাশিয়ার দাবির মুখে যুক্তরাষ্ট্র ‘দৃঢ়' অবস্থানে থাকবে বলে আশা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির।

সীমান্তের ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন রিয়ালস্ক নগরীর সর্বত্র দেখা যায় যুদ্ধের আঘাতের চিহ্ন। সেখানকার ঐতিহাসিক ভবন, জার আমলের অবকাঠামো, সংস্কৃতি কেন্দ্র ধুলোয় মিশিয়ে গেছে । এরকম এক ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে মেয়র সের্গেই কারনোসোভ রয়টার্সকে বলছিলেন, 'আমরা অবশ্যই শান্তি চাই। কিন্তু সেটা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই।' গত ২০ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় হামলায় কুরস্কের একটি ঐতিহাসিক সংস্কৃতি কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়। ঐ হামলায় ছয় জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়। রাশিয়ার অভিযোগ, মার্কিন হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঐ হামলা চালানো হয়। কুরস্কে ইউক্রেনীয় অভিযান শুরুর পর থেকেই ধীরে হলেও তাদের বিতাড়ন করতে সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল রুশ সেনাবাহিনীর। বিগত কয়েক সপ্তাহে তাদের অগ্রযাত্রার গতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। পুরো বিষয়ের নিয়মিত প্রতিবেদন করার জন্য সেখানে উপস্থিত থাকা সাংবাদিকদের খবর সংগ্রহ ও প্রচারে ক্রেমলিনের কোনো আপত্তি না থাকলেও রুশ বাহিনীর গতিবিধি ও ছবি প্রচার করতে নিষেধ করা হয়।

স্থানীয় অনেক বাসিন্দা বিশ্বাস করেন, কুরস্কে অতর্কিত হামলার কারণেই ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের মাত্রা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে মস্কো। তেমনই একজন হলেন ১৯৬৯ সালে চীন ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লিওনিড বোয়ারিনস্তেভ। 

পুরো যুদ্ধের জন্য পশ্চিমাদের দায়ী করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা একবার জিতে গেলেই শান্তি ফিরে আসবে। এরপর কেউ আর আমাদের হামলা করার সাহস দেখাবে না। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই বোমা বিস্ফোরণ ও সতর্ক সংকেত যেন ইউক্রেনীয়দের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। কুরস্কে অভিযান শুরুর পর থেকে সেখানকার অধিবাসীদের জীবনধারাও প্রায় একই রূপ নেয় । এখন তাদের একটাই চাওয়া, পরিস্থিতি যেন দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কুরস্ক থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে প্রায় বিতাড়িত করে দিলেও সেখানে এখনো প্রায় প্রতিদিনই বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজে কেঁপে উঠছে লোকালয়। চলাচলের পথে পুঁতে রাখা মাইনের আতঙ্ক বিরাজ করে মানুষের মনে। বাজার করতে যাওয়ার সময় আকস্মিকভাবে ভেসে আসে গুলির শব্দ। রিয়ালস্ক শহরের সংগীত শিক্ষক রিম্মা এরোফেয়েভা বিশ্বাস করেন, ঈশ্বরের কৃপায় তারা এখনো বেঁচে আছেন। যুদ্ধের বিভীষিকা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, সতর্ক সংকেতে মানুষ এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তারা এখন আর এসবে প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখায় না।

এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার শর্তে কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির জন্য রাশিয়ার দাবির মুখে যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। বুধবার প্যারিসে ইউরোপীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি প্যানেল সাক্ষাৎকারে এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন জেলেনস্কি । মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজ জানায়, সৌদি আরবে তিন দিনের পৃথক আলোচনা শেষে রাশিয়া ও ইউক্রেন কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর ক্রেমলিন একটি শর্তের তালিকা প্রকাশ করে। 

রাশিয়ার দাবি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, বিশেষ করে কৃষি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে । প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন সরকার রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ বিবেচনা করছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বুধবার জানিয়েছে, 'রাশিয়ার সেনা প্রত্যাহার ছাড়া’ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো সম্ভাবনা নেই।

ইত্তেফাক/এএইচপি