পরপর দু’টি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে মিয়ানমারে। দেশটিতে শুক্রবার (২৮ মার্চ) সকালে অল্প সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৭ এবং ৬ দশমিক ৪ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের পর রাজধানী নাইপিডোর সড়কে ফাটল দেখা দেয়। এ ভূমিকম্পের পর অনেক ভবনেও ফাটল দেখা গেছে। কম্পনের সময় অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
ভূমিকম্প–বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ২০ বছরে মিয়ানমারে এত মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার নজির নেই। এর প্রভাবে রাজধানীসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফায় কম্পন অনুভূত হয়েছে। এর পরাঘাত বা আফটার শক আরও হতে পারে।
ভূমিকম্পটি অনুভূত হয়েছে দেশটির রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। শুধু মিয়ানমার নয়, এই কম্পনের প্রভাব অনুভূত হয়েছে ভারত, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে। বাংলাদেশও তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করেছে এই ভূমিকম্পের। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারের রাজধানী শহর নাইপিডো থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী সাগাইং শহরে ১৬ থেকে ১৮ কিলোমিটার উত্তর–উত্তরপশ্চিমে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ভূমিকম্পের আতঙ্কে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন ও প্রতিবেশী থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও লোকজন ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য বলছে, ভূমিকম্পের কারণে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি নির্মাণাধীন ৩০তলা সরকারি অফিস ভবন ধসে পড়েছে। সেখানে কর্মরত অন্তত ৪৩ জন শ্রমিক ভেতরে আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। ভূমিকম্পের প্রভাবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর ব্যাংককের এই ভবনটি ধসে পড়ে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর অবশ্য বলেছে, ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ দশমিক ৩। তবে ভূমিকম্পের এই মাত্রা বেশ বড় বলেই বিবেচিত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা বলেন, আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের মান্দালয়। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল সাত দশমিক তিন। যা মেজর ক্যাটাগরির ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলছিলেন, মিয়ানামের সেন্ট্রাল বেসিনের একটি ফল্ট বা চ্যুতি আছে। এর নাম ‘সাগাইং ফল্ট’। এটি শান মালভূমি ও সেন্ট্রাল মিয়ানমার বেসিনের মাঝামাঝি এলাকা। সেখানেই এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এর প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হয়েছে।
যে অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছে, সেটি ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের’ মধ্যে পড়েছে। সাবডাকশন জোন হলো এমন একটি এলাকা, যেখানে দুটো টেকটোনিক প্লেট সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং একটি ডুব দেয় বা অন্যটির নিচে পড়ে যায়। এই ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনের’ বিস্তৃতি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা পর্যন্ত। এটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এ এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ হলেও গত ২০ বছরে এ অঞ্চলে এই মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার নজির নেই বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার। তিনি বলছিলেন, দিন দিন এ অঞ্চলে ভূমিকম্প বাড়লেও গত ২০ বছরে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, এমন নজির নেই। তাই এবারের এ ভূমিকম্প বেশ বড় ভূমিকম্প। এর প্রভাব বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়েছে।
প্রথমে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও উৎপত্তিস্থলের ২০ কিলোমিটারের দূরে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার। তিনি বলেন, এটি ছিল পরাঘাত বা আফটার শক। আরও কয়েকটি পরাঘাত হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, একসময় পৃথিবীর সব স্থলভাগ একত্রে ছিল। পৃথিবীর উপরিভাগের প্লেটগুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেছে। এই প্লেটগুলোকেই বিজ্ঞানীরা বলেন টেকটোনিক প্লেট। এগুলো একে অপরের সঙ্গে পাশাপাশি লেগে থাকে। কোনো কারণে এগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হলেই তৈরি হয় শক্তি। এই শক্তি সিসমিক তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। যদি তরঙ্গ শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটি পৃথিবীর উপরিতলে এসে পৌঁছায়। আর সেখানে পৌঁছানোর পর শক্তি অটুট থাকলে সেটা ভূত্বককে কাঁপিয়ে তোলে। এই কাঁপুনিই ভূমিকম্প।
এই প্লেটের নানা ভূগর্ভস্থ চ্যুতি আছে। সেগুলোই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং হিমালয়ের পাদদেশের এলাকাগুলো ভূমিকম্পপ্রবণ। দেখা যাচ্ছে, এসব স্থানে ভূমিকম্প বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ও এর কাছাকাছি এলাকায় ২৮টি ভূমিকম্প হয়। ২০২৩ সালে এর সংখ্যা ছিল ৪১। গত বছর তা বেড়ে হয় ৫৪।
