চাই মাদকমুক্ত তারুণ্য

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৫১

 

এখনকার তরুণদের বড় একটা অংশ চাকরির পিছনে না দৌড়ে উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে। মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে সফল উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। করছেন বড় অঙ্কের উপার্জন। এমন ব্যক্তিদের গল্পও নিয়মিত শোনা যাচ্ছে। ছাত্রাবস্থায় অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্টার্টআপ বা খণ্ডকালীন কাজ করে অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু কোনো বৈধ ব্যবসা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র কোটিপতি হয়েছে, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট তো দূরের কথা, যেকোনো সমীকরণেই এই কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় কি? কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে এমনই এক খবর প্রকাশিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র পাঁচ মাসে কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। কিন্তু কী তার ব্যবসা, মূলধনই বা কোথায়—উত্তর খুঁজতে অনুসন্ধানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সূত্র ধরে এগোতে এগোতে জানা যায়, টেকনাফের বাসিন্দা ওই ছাত্রের পুরো পরিবারের পেশাই মাদক ব্যবসা। ইয়াবা বিক্রি করে তারা কোটিপতি হয়েছেন। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের খুব পরিচিত একটি বিজ্ঞাপন হলো ‘মাদককে না বলুন’। কিন্তু এই প্রচারণার পরও সত্যিই মাদককে ‘না’ বলছেন কতজন? নানা পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারের অসংখ্য তরুণ আক্রান্ত হয়েছে সর্বনাশা মাদকের নেশায়। এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, ‘নেশাগ্রস্ত যুবকের গুলিতে খুন’, ‘মাদকাসক্ত ছেলের হাতে বাবা-মা খুন’, ‘ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় মারধরের শিকার বড়ভাই’ শিরোনামের ভয়াবহ খবরগুলো।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের পঞ্চাশভাগ তরুণ নানারকম নেশায় আসক্ত। এদের আশিভাগই ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করে। আর তাদের মাদকে আসক্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা। এ পরিসংখ্যান যতটা ভয়াবহতা প্রমাণ করে, বাস্তবচিত্র তারচেয়েও ভয়াবহ। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সন্ধ্যা নামার পর পরই অলিগলিগুলোর নির্দিষ্ট জায়গায় মাদক বিক্রি শুরু হয়। এ মাদকদ্রব্য ক্রেতাদের বেশিরভাগই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা এসব ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে। পর্যায়ক্রমে ওই শিক্ষার্থীরা বন্ধুবান্ধবদেরও মাদক নিতে প্ররোচিত করে, এভাবে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নেটওয়ার্ক। শুধু তাই নয়, স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এই ক্রেতার তালিকায় রয়েছে। মাদক নিচ্ছে মেয়েরাও! সরকারি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ছড়িয়ে পড়ার কারণে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের যে ছাত্ররা মাদকাসক্ত, তারা মাদকের অর্থের জোগান দিতে গিয়ে নানা অপকর্মে জড়াচ্ছে। মাদক কেনার টাকার জন্য সন্তানের কাছে বাবা-মা জিম্মি হচ্ছেন। পরিবারে বিরোধ বাড়ছে, সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ সময়ের তরুণদের মাদকাসক্তির ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মাদকাসক্তির প্রধান কারণ হলো হতাশা। মূলত নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সুশিক্ষার অভাব, বিভিন্ন অপসংস্কৃতির প্রভাব ও পরিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়নসহ নানা কারণেই তরুণেরা মাদক গ্রহণ করছে। কেউ কেউ বন্ধু বা সহপাঠীদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে কৌতূহলবশত মাদক গ্রহণ করে। অনেক শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের হতাশা থেকেও মাদকে ঝুঁকছে। অনেক ক্ষেত্রে সচেতন নন অভিভাবকেরাও।’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইশরাক শালিহ তালুকদার বলেন, ‘সহপাঠীদের অনেকেই প্রায় সময় বিভিন্ন মাদকদ্রব্য নিয়ে কথা বলে। শুনেছি তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে কয়েকজন একত্র হয়ে মাদকগ্রহণ করে। এটা তাদের কাছে ফ্যাশন।’

মাদক নিতে শুরু করার পর মাদকসেবীর কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা দেয়। তারা বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনা করে, সারাক্ষণ অস্থিরতায় ভোগে। কোনো কাজে মনোসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। এদের অনেকের ধারণা, ইয়াবা খেলে চাঞ্চল্য বাড়ে। কিন্তু শুরুর দিকে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও তা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নষ্ট করে দেয়। মাদকাসক্তির কারণে স্নায়ুতন্ত্র, হূদযন্ত্র, যকৃত, ফুসফুস, প্রজননতন্ত্র, কিডনি, পাকস্থলীসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মনোশিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে যে, মাদকের জন্য পরিবারের লোকজনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। পরিবার সন্তানের খোঁজখবর না-নেওয়ার ফলেও অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এটা অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা জানেনও না। তাই মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে পরিবার ও দেশকে রক্ষা করতে হলে দরকার সচেতনতা। কঠোর হতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও।’

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের মতো ব্যাধিকে দূর করতে হলে পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে, পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মাদকাসক্তদের জন্য দেশে বেশকিছু নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। কাউন্সিলিং ও চিকিত্সার মাধ্যমে তাদের সুস্থ করে তোলা যায়। চিকিত্সার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হলেও সঠিক চিকিত্সার মাধ্যমে একজন মাদকসেবীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা যায়। যে তরুণেরা ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দেবে, সেই তরুণদের মাদক থেকে রক্ষা করা না গেলে দেশের ভবিষ্যত্ হুমকির মুখে পড়বে। তাই এখন থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, যারা মাদকাসক্ত, তাদের কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে হবে; পাশাপাশি কঠোরভাবে দমন করতে হবে মাদকের উত্সগুলোকে। সন্তান যাতে মাদকের প্রতি না-ঝুঁকে, সেজন্য বাবা-মাকেই প্রাথমিক ভূমিকা নিতে হবে। আর তারা যদি সন্তানের মাঝে মাদকাসক্তির কোনো লক্ষণ খুঁজে পান, তবে সবার আগে তাদেরই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবেই গড়ে উঠুক মাদকমুক্ত তারুণ্য।