সিনেমা রিভিউ

‘চক্কর ৩০২’-এর চক্করে...

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১৮:২২

আমি কোনো চলচ্চিত্র সমালোচক নই। চলচ্চিত্র সমালোচনার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র-প্রকৌশল বিষয়ক যেসব পরিভাষা জানা আবশ্যক, তার কোনোটাই আমার জানা নেই। নিতান্তই একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে ‘চক্কর ৩০২’ সিনেমাটি দেখতে বসে নিজেই এক চক্করের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম।

গল্পের শুরু হয় একটা নৃশংস খুনের মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ডে ফেঁসে যায় খুন হওয়া সাদমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ডাকসাইটে সুপারস্টার হাসান চৌধুরীর কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলে রায়ান। খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে দায়িত্ব পড়ে ডিবি পুলিশ অফিসার মইনুলের ওপর। নিম্ন-মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট নিয়ে বড় হওয়া মইনুল একজন সৎ, কর্তব্যপরায়ণ ও কৌতুকপ্রিয় পুলিশ অফিসার। রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে মইনুল বুঝতে পারেন, এই খুনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় কোনো চক্র। সেকি পিচ্চি লিটন? কুখ্যাত সন্ত্রাসী গন্ডার বাবু? মিজান চৌধুরী? নাকি অন্য কেউ?

রহস্য উন্মোচনে একদিক থেকে কিছুটা অগ্রগতি হতে না হতেই অন্য দিক থেকে ঘিরে ধরে আরও রহস্যের জাল। জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে রহস্যভেদ। পুলিশ অফিসার মইনুল নিজেই যেন এক চক্করে পড়ে যান। এভাবে টানটান উত্তেজনায় এগিয়ে যায় গল্প। এক মুহূর্তের জন্যও পর্দা থেকে মনোযোগ বিচ্যুত হয়নি। সাসপেন্স, বিস্ময়, উদ্বেগ এবং প্রত্যাশা কাজ করেছে প্রতিটি দৃশ্যান্তরে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমিও যেন এক গোলকধাঁধায়, এক রহস্যাবৃত্তে আটকে গিয়েছিলাম।

এই সিনেমার গল্প বলার ধরনটি সরলরৈখিক নয়, বলা যায় অ-রৈখিক। গল্পের উপরিতলে একইসঙ্গে দুটি ঘটনার পাশাপাশি হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু অন্তর্নিহিত বিবেচনায় এ সিনেমায় অনেকগুলো গল্প বলার প্রয়াস রয়েছে। আভিজাত্যের মিথ্যা খোলসে ঢাকা উচ্চবিত্ত পরিবারের অস্থিতিশীল সম্পর্কের গল্প এটি; পিতা-মাতার দ্বন্দ্ব, পরকীয়ার বলি সন্তান কিংবা নেশার ছোবলে অন্ধকার জগতের কালো থাবায় সম্ভাবনাময় তারুণ্যের ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার গল্পও বটে। একইসঙ্গে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট ছোট অভিমান, হাসি-রাগ, খুনসুটির গল্প; এবং শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক সম্পর্ক তৈরির গল্পও ‘চক্কর ৩০২’।

এই যে একই সঙ্গে এতগুলো স্তর, এতগুলো গল্পের সন্নিবেশ, তাতে দর্শক হিসেবে আপনি একটা চক্করে পড়তেই পারেন। কিন্তু সিনেমার শেষ দিকে খুঁজে পাবেন সব গল্পের থই, খুলে যাবে সব রহস্যের জট। কিন্তু আসলেই কি জট খোলে? আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদাররা কি কখনো ধরা পড়ে ? নাকি উন্মোচিত হয় কেবল তাদের ছায়া? এই প্রশ্নবোধকটি ছুড়ে দিয়ে শেষ হয় সিনেমাটি।

এই সিনেমার কুশীলবদের মধ্যে প্রায় সবাই ছোটপর্দার অভিনেতা। কিন্তু অভিনেতা বটে। মোশাররফ করিম সবসময়ই সেরা। তার সাধ্যের সবটুকুই উজাড় করে দিয়েছেন ‘চক্কর ৩২’-এ । গ্রাম থেকে আসা একজন সৎ, হিউমারিস্ট পুলিশ অফিসার মইনুলের চরিত্রে মোশাররফ অদ্বিতীয়। অভিনেতা সুমন আনোয়ার গন্ডার বাবু চরিত্রে তার জাত চিনিয়েছেন। মোশাররফ করিমের সহযোগী হিসেবে শাশ্বত দত্তর উপস্থিতি খুবই যথোপযুক্ত। সাদমানের মায়ের ভূমিকায় মৌসুমী নাগকে একজন অসহায় সিঙ্গেল মাদারই মনে হয়েছে। তারিন, ইনতেখাব দিনার, রওনক হাসানও তাদের নামের সঙ্গে অবিচার করেননি। মোশাররফ করিমের বিপরীতে গৃহিণী রিকিতা নন্দিনী শিমুকেও বেশ মানিয়েছে।

‘‌চক্কর ৩০২’-এর আবহসংগীত গল্পটাকে চমৎকারভাবে সাপোর্ট দিয়েছে। একটা থাপ্পরের শব্দ ছাড়া তেমন আর কিছুই কানে লাগেনি। গানের বিষয়ে কিছু বলব না, কেননা ‘বোকা মানুষ’ শিরোনামে আমার লেখা একটা গানও রয়েছে। গানের ব্যাপারে অন্যরা বলবেন।

ছোট একটা অনুযোগ। ইমোশন তৈরির জন্য দর্শকদের একটু স্পেস দিতে পারতেন পরিচালক। প্রতিটা দৃশ্য এতটাই টান টান ছিল যে, ইমোশন তৈরির অংশগুলোও ছাড় পায়নি।

‘চক্কর-৩০২’ নির্মাতা শরাফ আহমেদ জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সে হিসেবে নির্মাণে তেমন কোনো কমতি টের পাইনি বললেই চলে। গল্প, সংলাপ, সিনেমাটোগ্রাফি- সবই সর্বাঙ্গসুন্দর মনে হয়েছে। মাঝে মাঝে খুব সিরিয়াস মুহূর্তে ছোট ছোট রসিকতা দর্শকদের উজ্জীবিত করে রেখেছে। সবশেষে বলতে চাই, ভায়োলেন্সহীন, পরিচ্ছন্ন, দুর্দান্ত একটি সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা হলো।

কাছের দূরের সকল বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের হলে গিয়ে ‘চক্কর ৩০২’ দেখার আমন্ত্রণ রইল। আশা করি, সন্তুষ্টি নিয়েই হল থেকে বের হবেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের জয় হোক।

ইত্তেফাক/এসএ