সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ জরুরি
g মোঃ লুত্ফুর রহমান
এক সময়ে দেশে পাটখাত ছিল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রথম স্থান অধিকারী। বর্তমানে এর স্থান তৃতীয়। দুর্নীতি, লুট-পাট, অনিয়ম, কয়েকযুগ আগের যন্ত্রপাতি, দেশে-বিদেশে বাজার অব্যবস্থাপনা, বাজার প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা ইত্যাদি নানা কারণে আজ পাটশিল্পের অধগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি খাতে বিজেএমসির অবশিষ্ট পাটকলগুলো আজ ডুবতে বসেছে। বেসরকারি পাটকল মালিকরা লোকসানে হাবুডুবু খাচ্ছে। রপ্তানি আদেশ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় পাটপণ্য রপ্তানিকারকরা দিশেহারা। ইপিবি-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০১৮-২০১৯ বছরে পাটপণ্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১০৮৫ মিলিয়ন ডলার। এগার মাসে অর্জিত হয়েছে ৭৭৩.৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২১.৪৫% পিছিয়ে। আর বিগত ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে অর্জিত ১০২৫ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ২০.০% পিছিয়ে ছিল। শতভাগ মূল্য সংযোজিত রপ্তানিপণ্য পাটখাতের বর্তমান এমন দুর্দশা মেনে নেওয়া যায় না। সময় এসেছে এ দুর্দশার কারণ উদ্ঘাটন করার, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা ও সমাধানে আন্তরিক হয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া। বাংলাদেশে উত্পাদিত মোট পাটপণ্যের ৭০% ওপরে বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকদের মাধ্যমেই সরাসরি রপ্তানি হয়ে থাকে। এরপরও রপ্তানিকারকদের যথাযথ মূল্যায়ন নেই।
অন্যদিকে পাটপণ্য উত্পাদক হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি পাটকলগুলো বছরের পর বছর সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেমন- ব্যাংক ঋণ, ব্যাংক ঋণ পুনঃ তপসিলকরণ, রপ্তানি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, ট্যাক্স রেয়াত সুবিধা ইত্যাদি পেয়ে আসছে। এরপরেও সরকারি পাটকলগুলো লোকসান কাটিয়ে উঠতে পেরেছে কী? অথচ বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক চাওয়া ও দাবি- রপ্তানির এফওবি মূল্যের উপর ৫% উত্সাহ প্রণোদনা, যা বাজার উন্নয়নে বা তীব্র বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে খুবই জরুরি। তৈরিপোশাক ও চামড়াখাতের বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকরা নগদ সহায়তা পাচ্ছে।
বিজেএমসির সাথে আমাদের নানা ধরনের ব্যবসায়িক জটিলতা রয়েছে যা রপ্তানি বাজারে নেতিবাচক হিসেবে কাজ করছে। আশা করি বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ রপ্তানি বাজার ও রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থে অচিরেই বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সচেষ্ট হবেন। ব্যাংক ঋণের কথা ধরা যাক। পণ্যের জাহাজীকরণ পূর্ববর্তী ঋণতো দূরের কথা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিগত প্রায় চার বছর যাবত্ রপ্তানিকারকদের পণ্য জাহাজীকরণকৃত বা জাহাজীকরণ পরবর্তী যথাযথ রপ্তানি বিল লেটার অফ ক্রেডিটের বিপরীতে পারচেজ বা নিগোশিয়েট করে টাকা প্রদান করে না, যা একটি বড় ধরনের সমস্যা। এতে করে রপ্তানিকারকদের ও পাটকলগুলোকে আর্থিক সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা কার্যকরী এ ব্যবস্থায় হঠাত্ কেন ছেদ পড়ল? রপ্তানি নীতিতে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তা মানছে না।
পাটখাত এখন খুবই দুর্বল। রপ্তানি চালানের ওপর যেকোনো ধরনের যেকোনো পরিমাণ অগ্রিম কর কর্তন হবে আরো একটি রপ্তানি প্রতিবন্ধকতা। কেননা, কোনো রপ্তানি চালানে লোকসান হলেও কর কর্তন করা হয়, চালানে জাহাজ ভাড়া যুক্ত থাকলেও ভাড়ার ওপর কর কর্তন করা হয়। অথচ, জাহাজ ভাড়া পণ্য মূল্যের কোনো অংশ নয়, বরং বিদেশি ক্রেতা জাহাজ ভাড়া অগ্রিম হিসেবে পণ্য মূল্যে যুক্ত করে দেয় মাত্র। এতে করে আমাদের পণ্যমূল্য বহির্বিশ্বে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারায়। আর যদি অগ্রিম কর আরোপ করতেই হয়, তবে যেন তাহয় অতি অল্প এবং সকল রপ্তানিকারকের ক্ষেত্রে সমান।
আমরা অনেকেই অবগত আছি যে, সহজে ব্যবসায় শুরু করার বিশ্ব সূচকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে, এমনকি আফগানিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে। আবার, কম খরচে ব্যবসা করার বিশ্ব সূচকেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ব্যবসায়িক খরচ কমাতে আমরা সরকারের নিকট দাবি করছি যেন পাট অধিদপ্তরের বার্ষিক লাইসেন্স নবায়ন ফি পনের হাজার টাকা করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয় বাস্তবায়নের জন্য সরকারের নিকট অনুরোধ রাখব। এক- সময়ের সাথে প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে। দরকার পাটকল আধুনিকায়ন, অধিক পরিমাণে গুণগতমান সম্পন্ন পণ্য উত্পাদন, উত্পাদন খরচ কমানো ইত্যাদি। দুই- কোনো বিষয়ে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছাতে হলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান অপরিহার্য। তাই জরুরিভাবে দরকার পাট সংক্রান্ত একটি পাট বাজার গবেষণা পরিসংখ্যান ও উন্নয়ন কাউন্সিল বা বোর্ড।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বর্তমান বিশ্বে উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থায় পণ্যমূল্য বেশ প্রতিযোগিতামূলক। রপ্তানি বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই সমস্যাসমূহ দূর করে সুদূর প্রসারী ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য যা যা দরকার, সেজন্য স্বয়ং সরকার ও বেসরকারি জুট মিলের সংস্থাসমূহ রপ্তানিকারকদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলে পাটপণ্য রপ্তানিখাতের সমস্যাসমূহ দূর হবে এবং এখাত অনেক এগিয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। নতুবা পাট নিয়ে যতই গর্ব আমরা করি না কেন, এখাতের ঘুরে দাঁড়ানো বড়োই কঠিন হয়ে থাকবে।
লেখক: ঊর্ধ্বতন ভাইস-চেয়ারম্যান, বিজেজিইএ
