ঢাকায় ভিক্ষাবৃত্তি ঘিরিয়া এক ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরির বিষয়টি নূতন নহে। ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ ও ভিক্ষুক পুনর্বাসনে সরকারের এখন কোনো প্রকল্প নাই। ফলে একদিকে যেমন ভিক্ষুকের সংখ্যা কমিতেছে না, অন্যদিকে ভিক্ষাবৃত্তি ঘিরিয়া তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে ব্যবসায় করিয়া যাইতেছে। এমনকি অভিজাত এলাকাগুলিতে রাস্তার পাশে ভিক্ষুক নিষিদ্ধের সাইনবোর্ড থাকিলেও ভিক্ষাবৃত্তির ঘটনা বিরল নহে। কিছু কিছু এলাকায় রহিয়াছে মৌসুমি ভিক্ষুক। যেমন—রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানের সামনে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে জড়ো হন প্রায় অর্ধশত ভিক্ষুক, যাহাদের একটি বড়ো অংশই ভিক্ষা করেন সপ্তাহে ঐ একটি দিন। ইহা ছাড়াও অনেকেই আছেন যাহারা শারীরিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কাজ না করিয়া বিভিন্ন অজুহাতে ভিক্ষাকেই অর্থ উপার্জনের উপায় হিসাবে বাছিয়া লইয়াছেন।
একটি সহানুভূতিশীল সমাজ অতি দরিদ্র অসামর্থ্য ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করিবে—ইহাই স্বাভাবিক। সকল ধর্মেই দীনে দয়া করিবার কথা বলা আছে। সুতরাং দীনের প্রতি আর্থিক দয়া প্রদর্শন সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতে খারাপ কিছু নহে। যদিও ভিক্ষাবৃত্তি একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য ভালো ভাবমূর্তি তৈরি করে না। কেননা, সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি করিবার মতো অতি দরিদ্র মানুষ থাকিলে তাহা রাষ্ট্রের জন্যও লজ্জার। কিন্তু মানুষের সহমর্মিতার সুযোগ লইয়া একটি গোষ্ঠী যদি পেশাদার ভিক্ষুক তৈরি করে—তবে তাহা ভালো কথা নহে। ইতিপূর্বে অসংখ্যবার গণমাধ্যমে প্রকাশ হইয়াছে যে, রাজধানীতে চলিতেছে শিশুকে অসুস্থ বানাইয়া নিষ্ঠুর ভিক্ষা ব্যবসায়। ইত্তেফাকে গত শুক্রবার এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, অন্য পেশার চাইতে ভিক্ষাবৃত্তি বেশি লাভজনক। শিশুরা যত অসুস্থ তত বেশি আয় হয়। দিনে তিন শত হইতে হাজার টাকা অবধি আয় হয়। ভিক্ষাবৃত্তি পেশায় জড়িত পঙ্গুদের গাড়ি ঠেলিয়া আয়ের ৫০ ভাগ টাকা তাহারা পান। অনেকে শিশু ভাড়া নেন ভিক্ষাবৃত্তির জন্য। এই ভাড়াটে শিশু লইয়া ভিক্ষার নেপথ্যে রহিয়াছে শক্তিশালী একটি চক্র। এই চক্রটি শিশু চুরি হইতে শুরু করিয়া দরিদ্র, স্বামী পরিত্যক্তা ও মাদকাসক্ত মায়েদের বাচ্চা ভাড়া লইয়া ভিক্ষাবৃত্তি চালাইয়া থাকে। দিন শেষে শিশু ভাড়া হিসাবে দেড় হইতে দুই শত টাকা আর কিশোরী মায়ের জন্য কিছু দিয়া বাকি টাকা হাতাইয়া লইতেছে ঐ চক্রটি। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে আরো বলা হইয়াছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনেই শিশুদের দিয়া এমন নির্মম ব্যবসায় চালাইলেও কেহ কিছু বলিতেছে না। কিছুদিন পূর্বে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গিয়াছে, আমাদের দেশে কর্মজীবী শিশুদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ শহরে বাস করে। আবার এই ৫৫ শতাংশের মধ্যে ৯ শতাংশ শিশু ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত।
জরিপ, পরিসংখ্যান যাহাই হউক, শিশুরা ভিক্ষা করিবে—ইহা কাহারোই কাম্য নহে। সুতরাং শিশুদের ভিক্ষুক বানানোর কারিগরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইতে হইবে। তাহা ছাড়া, ভিক্ষুক নির্মূলে কার্যকর প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণ করিতে হইবে। ইতিপূর্বে গৃহীত প্রকল্প কেন ব্যর্থ হইয়াছে—তাহার কারণও অনুসন্ধান করা দরকার।
