g চিররঞ্জন সরকার
মান্না দের একটা বিখ্যাত গান আছে: ‘তোমার নিঃশ্বাসে বিষ ছিল আমি বিশ্বাস করিনি, ওরা বলেছিল বহুবার কারো কথা কানে ধরিনি...’। আমরা অনেক কথাই বিশ্বাস করি। আবার অনেক কথা করি না। আমাদের কাছে কোন কথাটা যে বিশ্বাসযোগ্য হবে, আর কোনটা নয়, সেটা বলা খুবই দুঃসাধ্য। এভাবে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে বয়ে যায় আমাদের জীবন-নৌকা। বিশ্বাস কত প্রকার? অনেক প্রকার। যেমন—সরল বিশ্বাস, জটিল বিশ্বাস, কূটিল বিশ্বাস, কঠিন বিশ্বাস, তরল বিশ্বাস, বায়বীয় বিশ্বাস, গরল বিশ্বাস, দৃঢ় বিশ্বাস, স্বল্প বিশ্বাস, মাঝারি বিশ্বাস, ভারী বিশ্বাস, টলটলায়মান বিশ্বাস, লোক দেখানো বিশ্বাস ইত্যাদি। এর বাইরেও আরো অনেক বিশ্বাস আছে। যেমন : দেবব্রত বিশ্বাস, অপু বিশ্বাস, দিলীপ বিশ্বাস, আবদুর রহমান বিশ্বাস! যাহোক, রসিকতা বাদ দিয়ে এবার মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।
বিশ্বাস কী? অভিধান মতে, বিশ্বাস বি. ১ প্রত্যয়, সত্য বা যথার্থ বলে ধারণা (ঈশ্বরবিশ্বাস); ২ আস্থা (লোকটির ওপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে); ৩ শ্রদ্ধা (ধর্মবিশ্বাস), যোগ্য বিণ. বিশ্বাসের পাত্র, যাকে বিশ্বাস করা যায়। বিশ্বাসী (-সিন্) বিণ. ১ বিশ্বাসভাজন (বিশ্বাসী চাকর); ২ বিশ্বাস করে এমন (ভগবদ্বিশ্বাসী)। বিশ্বাস্য বিণ. বিশ্বাসযোগ্য।
কোনো এক বিদেশি কবি লিখেছিলেন, ‘বিশ্বাসহীন বেঁচে থাকা/ আর ঘন কুয়াশার মধ্যে গাড়ি চালানো/ দুটো একই ব্যাপার।’ এই বিশ্বাস অনেক সময়েই হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস। কিন্তু সব সময়ে তা নয়। আরো অনেক বিশ্বাস নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে, সুদিন আসবে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতি, নারী নির্যাতনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে, ছেলে মানুষ হবে, সংসারে নাতবউ আসবে। ছোটো-বড়ো, সামান্য অসামান্য, তুচ্ছাতিতুচ্ছ থেকে বৃহত্তর নানান বিশ্বাসকে আশ্রয় করেই মানুষ বাঁচে। আবার বিশ্বাসকে ভর করেই মানুষ প্রাণ দেয়, প্রাণ নেয়। প্রবল অটল সেই বিশ্বাস। কখনো কুর্দি, কখনো আইএস, কখনো প্যালেস্টাইন, কখনো মাও, কখনো চে গুয়েভারা, কখনো নিতান্তই জয় বাংলা কিংবা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে।
বিশ্বাসের কোনো সূত্র নেই, সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই। যদি তুমি বিশ্বাস করলে তো করলে, সে ভূত কিংবা ভগবান কিংবা দুয়ের মধ্যে, অথবা এই দুইয়ের বাইরে যা-ই হোক। আর যদি না-ই করো না-ই করলে, বিশ্বাস যত সহজ, অবিশ্বাস তত অনায়াস। খরার দেশের সেই আশ্চর্য গল্পটা মনে আছে?
প্রচণ্ড খরা চলছে সারা এলাকা জুড়ে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছর শেষ হতে চলল, এক বিন্দু বৃষ্টি নেই। আকাশে এক টুকরো মেঘ নেই। সেই রাজ্যে ফুল নেই, ফল নেই, ফসল নেই। অবশেষে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, তারা বৃষ্টিদেবীর আরাধনা করবে, বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করবে। একটি শুভদিন বেছে নিয়ে সাব্যস্ত হলো, দেশের সবচেয়ে বড়ো মাঠে সন্ধ্যাবেলায় উপস্থিত হয়ে সবাই বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করবে। নির্দিষ্ট সন্ধ্যায় প্রার্থনার নির্দিষ্ট স্থানে সমস্ত লোক একত্র হলো দেবীর কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনায়।
সবাই ঠিকঠাক এসেছে, শুধু একজন হাস্যকর চরিত্র একটি ছাতা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। ‘সন্ধেবেলা ছাতা দিয়ে কী হবে?’ সবার কৌতূহলী প্রশ্নে জবাবে সেই চরিত্র বলল, ‘আগে বলো, তোমরা ছাতা আনোনি কেন?’ সবাই বলল, ‘ছাতা? ছাতা দিয়ে কী হবে? সন্ধেবেলা কি রোদ উঠবে?’
হাস্যকর চরিত্রটি বলল, ‘রোদ কেন? আমরা এসেছি বৃষ্টির প্রার্থনায়। বৃষ্টি তো আসবে। তখন ভিজতে হবে তোমাদের।’
সেদিন প্রার্থনা শেষে সত্যিই অঝোরধারায় বৃষ্টি নেমেছিল। সব অবিশ্বাসী প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল জলধারায়। শুধু সেই হাস্যকর মানুষটি ভীষণ বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় দিয়ে একাকী বাড়ি ফিরেছিল!
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘পেনাল কোড (সিআরপিসি) অনুযায়ী, সরল বিশ্বাসে কৃতকর্ম অপরাধ নয়। তবে সরল বিশ্বাস যেন সরল বিশ্বাসই হয়, তা নিশ্চিত হতে হবে।’
বিশ্বাসের মানে অভিধান ঘেঁটে আগেই বের করেছি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে : ‘সরল বিশ্বাস’ মানে কী?
জেনারেল কজেস অ্যাক্টের ৩ (২২) ধারায় বলা হইয়াছে যে, সততার সহিত যে কাজ করা হয় তাহা অবহেলাবশত করা হউক বা না হউক সদ্বিশ্বাসে করা হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।
তামাদী আইনের ২ (৭) ধারায় সরল বিশ্বাসের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যদি যথাবিহিত যত্ন ও মনোযোগ সহকারে কোনো কাজ না করা হয় তাহা হইলে সরল বিশ্বাসে করা হইয়াছে বলিয়া বুঝাইবে না।
দণ্ডবিধির ৫২ ধারায় সরল বিশ্বাসের সংজ্ঞা মতে, যথাবিহিত সতর্কতা ও মনোযোগ ব্যতিরেকে কিছু করা হইলে না কোনো কিছু বিশ্বাস করা হইলে তাহা ‘সরল বিশ্বাসে’ করা হইয়াছে বা তাহাতে সরল ‘বিশ্বাসে’ বিশ্বাস করা হইয়াছে বলিয়া বিবেচনা করা হয় না।
দণ্ডবিধির ৭৬ ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তি আইনবলে কোনো কার্য করিতে বাধ্য বলিয়া সরল বিশ্বাসে উক্ত কার্য করিলে তাহার অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।
এ কথা ঠিক যে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ‘সরল বিশ্বাসে’ সরকারি চাকরীজীবীদের ‘কৃতকর্ম’ কোনো অপরাধ নয়। তবে সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ সরল বিশ্বাসে কৃতকর্ম আর সরল বিশ্বাসে দুষ্কর্ম দুইটা দুই জিনিস। এখানে একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।
অনেক গবেষক বলে থাকেন, মোবাইল ফোনে যে রেডিয়েশন হয়, তা মানব-শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তা ছাড়া দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন কানে দিয়ে কথা বললে, কান ও মস্তিষ্কেরও ক্ষতি হয়। এসব কারণে সরল বিশ্বাসে আমি আমার আইফোনটি ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। এটা কোনো অপরাধ নয়।
অপর পক্ষে, আমি শুনেছি আইফোন ব্যবহার করতে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য। সুন্দর ছবি তোলা যায়। নিরাপত্তা ভালো। স্পষ্ট সবকিছু শোনা যায়। কিন্তু আমার আইফোন নেই। কাজেই আমি আরেকজনের একটা আই ফোন সরল বিশ্বাসে তাকে না জানিয়ে নিজের মনে করে নিয়ে এলাম। তাকে কী বলব? অবশ্যই চুরি।
সরল বিশ্বাসে সব কৃতকর্ম তাই ক্ষমাযোগ্য হতে পারে না। অপরাধ অপরাধই। সেটা যে বিশ্বাস থেকেই করা হোক। এমনকি অবিশ্বাস থেকে করা হলেও।
এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিয়ে একটি পুরোনো গল্প মনে পড়ছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গৌরবময় যুগে তখন তার সীমানা ছিল দিগন্তবিস্তৃত। বলা হতো যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। কথাটার মধ্যে একটু বাড়াবাড়ি আছে মনে হলেও আসলে এটা এক অর্থে ভৌগোলিক সত্য। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মহাদেশগুলোর মধ্যে এতদূর প্রসারিত ছিল যে, যখন তার এক অংশে সূর্য অস্ত যেত, ঠিক তখনই অন্য আরেক অংশে সূর্য উদিত হতো। ফলে পুরো রাজ্যে কখনোই সূর্য অস্ত যেত না।
আইরিশদের সঙ্গে চিরদিনই ইংরেজদের মন-কষাকষি। বাদ-বিসম্ব্বাদ। একজন আইরিশ সুযোগ পেলেই ইংরেজদের সম্পর্কে কটু ও অপমানজনক মন্তব্য করে। সুতরাং এ কথা যখন আইরিশরা শুনল যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না, তখন একজন আইরিশ বলল, এটা খুবই ভালো কথা। খবরটা শুনে খুবই স্বস্তি পাওয়া গেল।
ভূতের মুখে রাম নামের মতো একজন আইরিশের মুখে ইংরেজের এই প্রশস্তি বা স্তুতিবাক্য শুনে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এরপর একটু গলা নামিয়ে সেই আইরিশ বলেছিল, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যে সূর্য অস্ত যায় না, এটা প্রকৃতই খুবই সুখবর, বিশেষ করে এই সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের জন্য। কারণ, সূর্যাস্তের পর ইংরেজদের মোটেই বিশ্বাস করা যায় না। সূর্যাস্ত না হওয়াই লোকদের পক্ষে নিরাপদ।
তবে কি দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-দুষ্কর্ম রুখতে ব্যর্থ হয়ে ‘সরল বিশ্বাসে’ সব ধরনের ‘কৃতকর্মের’ বৈধতা দিয়ে দিলেন? এতে অবশ্য সরকারি কর্মকর্তাদেরও সুখ। দুর্নীতি দমন কমিশনেরও স্বস্তি। ‘সরল বিশ্বাসে’ কিছু করলে তাতে অনুশোচনারও কিছু নেই, লজ্জারও কিছু নেই। দায়ও নেই, দায়িত্বও নেই। সব কিছুই সুন্দর ফকফকা!
সরল বিশ্বাসের জয় হোক!
n লেখক :রম্যরচয়িতা
