জুমের আগুনে পুড়ছে সবুজ পাহাড় 

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের তাগিদ 
মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে জুম চাষের জন্য পাহাড়গুলো অগ্নিদগ্ধ করায় মাটি শুকিয়ে ইট হয়ে যায়। এতে ছোট-বড় পাহাড় টিলাগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়। ফাটলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়ে ভয়াবহ আকারে পাহাড়ধস শুরু হয় 

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ১১:১৮

পার্বত্য এলাকায় শত শত সবুজ পাহাড়-টিলা পুড়ছে জুমের আগুনে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর টিলাভূমির সবুজ বনবনানি। আগুনে বন-বাদাড়ের সঙ্গে সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরই বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত মার্চ-এপ্রিল জুড়ে আগুনে পুড়িয়ে পাহাড়গুলো জুমচাষের জন্য প্রস্তুত করে জুমিয়া পরিবাররা। আদি পদ্ধতি ত্যাগ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষের জন্য পরামর্শ দেওয়া হলেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জুমিয়া পরিবারগুলো তা মানছে না। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে প্রায় ২২ হাজার হেক্টর টিলাভূমি জুম চাষের জন্য পোড়ানো হয়েছে। 

জানা যায়, প্রতি বছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে পাহাড় বা টিলা বেছে নিয়ে জুম চাষের জন্য নির্বিচারে বন জঙ্গল কেটে সাফ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা। বৃষ্টি এলে পুরো পাহাড়ের গায়ে গর্ত করে রোপণ করা হয় ধান, তুলা, তিল, তামাক, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শাকসবজির বীজ। 

কৃষি বিভাগসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, পাহাড়ি তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় বান্দরবানে। বান্দরবানের থানচি, রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায় উল্লেখজনকভাবে জুমচাষ হয়। এ জেলায় এ বছর প্রায় ১১ হাজার হেক্টরে জুম চাষের নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাঙ্গামাটি। এ জেলায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টরে জুম চাষ হবে। খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে জুম আবাদ কম হয়। খাগড়াছড়িতে এ বছর প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর টিলা ভূমিতে জুম চাষের প্রস্তুতি নিয়েছে পাহাড়িরা। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, অনেক সময় আগুনে ফলদ-বনজ বাগান, ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়াসহ প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। গত ১০ বছরে বান্দরবানে জুমের আগুনে পুড়ে মারা গেছে অন্তত ১৫ জন। পুড়ে গেছে কয়েকশ ঘরবাড়ি। 

খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং জেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির সদস্যসচিব মো. ফরিদ মিয়া বলেন, জুমের আগুনে শুধু বনই পুড়ে ছাই হচ্ছে না; অণুজীব, কীটপতঙ্গ, বন্য জীবজন্তু সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, যখন জঙ্গলে আগুন লাগানো হয়, তখন অনেক উপকারী মাইক্রোঅর্গানিজমস মারা যায়। যে মাইক্রোঅর্গানিজমসগুলো নিউট্রিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশনের জন্য দরকারি। অথচ আগুনে না পুড়েও জুম চাষ করা যায়। তিনি বলেন, শুকনো গাছ-গাছলা, ঝোপ-জঙ্গল পাহাড়ের এক স্থানে স্তূপ করে রাখলে বৃষ্টিতে ভিজে-পচে এগুলো জৈব সারে পরিণত হতো, যা জুম খেতের উবর্রতা বাড়াত। 

মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে জুম চাষের জন্য পাহাড়গুলো অগ্নিদগ্ধ করায় মাটি শুকিয়ে ইট হয়ে যায়। এতে ছোট বড় পাহাড় টিলাগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়। ফাটলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়ে ভয়াবহ আকারে পাহাড়ধস শুরু হয়। পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী ফিরোজ বলেন, প্রতি বছরই বর্ষায় পার্বত্য এলাকায় ব্যাপক হারে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ধসের কারণে পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা, খাল, নদীগুলো ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের মাটির ওপরের স্তর যাকে টপসয়েল বা উর্বর মাটি বলা হয়, ধসের সঙ্গে এ টপসয়েলও স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এতে পাহাড়গুলো অনুর্বর হয়ে পড়ছে। অথচ এক ইঞ্চি টপসয়েল তৈরি হতে প্রায় ১০০ বছর লাগে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরো বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ করা গেলে গাছপালা, বন্যপ্রাণী এবং পাহাড়ধস রোধ করা সম্ভব হবে। জুম চাষের মাধ্যমে আরো অধিক ফলনও উৎপাদন সম্ভব। 

মারমা উন্নয়ন সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মংপ্রু চৌধুরী বলেন, জুমের ক্ষতিকর দিক জেনেও বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় দুর্গম এলাকার পাহাড়ি পরিবারগুলো জীবন বাঁচানোর তাগিদে জুম চাষ করছে। সরকার জুমিয়া পরিবারদের যথাযথ পূর্নবাসন কিংবা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিলে জুমের ক্ষতিকারক অবস্থার উত্তরণ করা সম্ভব।

ইত্তেফাক/টিএইচ