১৯৮৮ সালের ২৬ এপ্রিল লালবাগের জগন্নাথ সাহা রোডের বাড়িতে খুন হন সীমা মোহাম্মদী। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে মামলা করেন। ২০০১ সালের ২৯ এপ্রিল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। কিন্তু ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে শেষ হয়নি বিচার। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সকের সাক্ষ্যের অভাবে ঝুলে আছে বিচার কাজ। সাক্ষ্য দিতে চিকিত্সকের প্রতি একাধিকবার সমন জারি করা হলেও আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেননি তিনি। ফলে বিলম্বিত হচ্ছে মামলার বিচার। শুধু সীমা হত্যাই নয় এ ধরনের অনেক নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় যথাসময়ে বিচার শেষ হচ্ছে না। এছাড়া নানা অজুহাতে আসামি পক্ষের অহেতুক সময়ক্ষেপণ তো রয়েছেই। বিচার বিলম্বের জন্য জামিন পেয়ে যাচ্ছেন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত এসব মামলার আসামিরা। বিঘ্নিত হচ্ছে ন্যায়বিচার।
দেশের সকল আদালতসমূহের বিচারাধীন মামলা নিয়ে তিন মাস অন্তর অন্তর হিসাব বিবরণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ঐ প্রতিবেদনে গত নয় মাসের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার বিবরণী পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের জুলাই মাসে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৮১টি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দায়ের হয়েছে ২৩ হাজার নতুন মামলা। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬ হাজার ৮০৪টি। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত দায়ের হয়েছে ৪৭ হাজার নতুন মামলা। এ সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯২৪টি। বিচারাধীন রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫১টি মামলা। এছাড়া পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ৩৮ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু পেরিয়ে গেছে বছরের পর বছর। নিষ্পত্তি হয়নি মামলার। এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে সাত দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ে মুলতবি ছাড়াই মামলার বিচার কাজ সম্পন্নের পাশপাশি সাক্ষীর হাজিরা নিশ্চিত করতে মনিটরিং কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। অফিসিয়াল সাক্ষী হাজির না হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ বেতন বন্ধের আদেশ দেওয়ায় বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের বলা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত মামলার বাদী সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, আসামি পক্ষের আইনজীবীদের অযথা সময়ের আবেদনের কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। মামলার অধিকাংশ সাক্ষী বাদী পক্ষের নিকটাত্মীয়। যথাসময়ে আদালতে উপস্থিত হয়ে এদের সাক্ষ্য না দেওয়াটাও অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি মামলাগুলোর অধিকাংশই সত্যাশ্রয়ী নয়। বিচারের পূর্বে অন্যান্য ফৌজদারি মামলার মতো যথাযথ তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় না। বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বেই বাদী-বিবাদী আদালতের বাইরে আপোষ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন এবং আদালতে উপস্থিত না থেকে মামলা দীর্ঘদিন চলমান রাখেন।
আইন কমিশন বলছে, সাক্ষ্য গ্রহণে বিলম্ব মামলার দীর্ঘসূত্রতার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ফৌজদারি মামলায় পুলিশকে দ্রুত সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। স্পর্শকাতর মামলা প্রমাণে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। অস্বাভাবিক অবস্থা ব্যতিরেকে মামলার শুনানি মুলতবি না করার বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে।
