বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশি এক নারী। তার নাম প্রিয়া সাহা। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক। তার দাবি, বাংলাদেশে ৩৭ মিলিয়ন (৩ কোটি ৭০ লাখ) হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানকে গুম করা হয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
গত বুধবার হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন ১৬টি দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ২৭ জন প্রতিনিধি। সেখানে বাংলাদেশের প্রিয়া সাহা ছাড়াও মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ইয়েমেন, চীন, কিউবা, ইরিত্রিয়া, নাইজেরিয়া, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, সুদান, আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও জার্মানির নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজ নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা তুলে ধরেন।
সেখানেই ট্রাম্পকে প্রিয়া সাহা বলেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সেখানে ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানকে গুম করা হয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই। এখনো সেখানে ১৮ মিলিয়ন (১ কোটি ৮০ লাখ) সংখ্যালঘু মানুষ রয়েছে। আমার অনুরোধ আমাদের সাহায্য করুন। আমরা দেশ ত্যাগ করতে চাই না। তিনি বলেন, আমি আমার ঘর হারিয়েছি, আমার ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি।
এ সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে জিজ্ঞেস করেন কারা এসব করছে? জবাবে বাংলাদেশি ঐ নারী বলেন, উগ্রবাদী মুসলিম গোষ্ঠী এ কাজ করছে। যারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গণমাধ্যম পুরো অনুষ্ঠানটি ফেসবুকে লাইভ করেছে। যার কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সাক্ষাতের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই প্রিয়া সাহার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। কেউ কেউ ট্রাম্পকে হ্যাশট্যাগ, মেনশন করে জানাচ্ছেন ঐ নারী (প্রিয়া সাহা) মিথ্যা কথা বলেছেন। তবে কেন তিনি এমন কথা বললেন তা জানা যায়নি।
ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগের বিষয়টি ইতিমধ্যে সরকারের নজরে এসেছে। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তার বক্তব্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের নিন্দা করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায় একাধিকবার ভরা হাউজে পৃথিবীর সব দেশের এবং বাংলাদেশ ও বাইরের দেশের এনজিওদের মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। যেখানে রানা দাশগুপ্তর মতো মানুষরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেওয়া প্রিয়া সাহার অভিযোগের মতো কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন কাউকে করতে দেখিনি। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। তার অভিযোগুলো সরকার শুনবে এবং খতিয়ে দেখবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পও জানেন যে, তার কাছেও মিথ্যা অভিযোগ করা হয়। মার্কিন প্রশাসন ঢাকায় তাদের দূতাবাসের মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত তথ্য পেয়ে থাকে এবং আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগে থাকি।
তিনি বলেন, প্রিয়া সাহার সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমালোচনা করছেন। এটাও ঠিক নয়। যেমনটি নয় প্রিয়া সাহার করা অভিযোগ। সমাজের সব স্তরে যার বিচরণ এবং সরকারের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যার যোগাযোগ তার এ রকম আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ। অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে বা না বুঝে এটার ক্ষতি করে ফেলেন। সবার উচিত এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা।
প্রসঙ্গত, প্রিয়া সাহা বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির এক জন সাংগঠনিক সম্পাদক। পাশাপাশি তিনি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘শারি’-এর নির্বাহী পরিচালক। এছাড়া বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য পরিষদেরও এক জন সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তার বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরের চর বানিরিতে। তার স্বামী বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) উপপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ কোথায় জানেন না ট্রাম্প:একই অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এক রোহিঙ্গা জানতে চান যে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে তার পরিকল্পনা কী? এর জবাবে তিনি বলেছেন, সেটা (বাংলাদেশ) আসলে ঠিক কোথায়? এ সময় ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ানো অপর একজন বলেন, ‘বার্মার পাশে’। ট্রাম্পের এমন জবাবে অনেকেই অবাক হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে।
প্রিয়া সাহার অভিযোগ সঠিক
নয়:মার্কিন রাষ্ট্রদূত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে প্রিয়া সাহা যে তথ্য দিয়েছেন তা সঠিক বলে মনে করেন না ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় বৌদ্ধ মন্দিরে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় একে অপরকে শ্রদ্ধা করে। আমার প্রথম ৮ মাসের দায়িত্ব পালনকালে আমি বাংলাদেশের আটটি বিভাগেই ঘুরেছি। মসজিদ, মন্দির ও চার্চে গিয়ে ইমাম পুরোহিতদের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন আমি এসেছি একটি বৌদ্ধ মন্দিরে, আমার কাছে যেমনটা মনে হয়েছে, এখানকার ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের লোকজন একে অপরকে শ্রদ্ধা করে। তাই আমি মনে করি, তার অভিযোগ সঠিক নয় বরং ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। যদিও কোনো দেশই সংখ্যালঘুদের অধিকার দিতে সফলতা পায়নি। তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলের প্রধান ইস্যুগুলো কী তা যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে।
পিরোজপুরে নানা আলোচনা
পিরোজপুর অফিস থেকে নাসিম আলী জানান, প্রিয়া সাহা ওরফে প্রিয়া বালা বিশ্বাস ‘শারি’ নামে বাংলাদেশের দলিত সম্প্রদায় নিয়ে তত্পর একটি এনজিওর পরিচালক। তার বাবার বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার চরবানিয়ারী গ্রামে হলেও শ্বশুর বাড়ি বৃহত্তর যশোরে। প্রিয়ার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুদকের সদর দপ্তরে উপ পরিচালক পদে কর্মরত। প্রিয়া সাহার ভাই জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত একজন যুগ্ম সচিব এবং দুটি মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও সেখানে পড়াশুনা করেন। চলতি বছরের শুরুতে প্রিয়ার বাবার বাড়ি চরবানিয়ারীতে ভাইয়ের একটি অব্যবহূত বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তখন অভিযোগ ওঠে পাশের বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার তত্কালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান শামীম জগদীশ বিশ্বাসের ঘরটি রাতের আঁধারে পুড়িয়ে দিয়েছেন তার লোকজন নিয়ে, সঙ্গে একটি মন্দিরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ওখানে শামীমের একটি মাছের ঘের রয়েছে। তখন পাল্টা অভিযোগ ওঠেছিল শামীমেরও তিনটি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল চিতলমারী এলাকায়। পুলিশসহ প্রশাসন এবং পিরোজপুর ও নাজিরপুরের সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে বারবার গিয়ে তথ্যাদি অনুসন্ধান করে তখন ঘটনার কূলকিনারা না পাওয়ায় এক পর্যায়ে সমগ্র ঘটনাটি আলোচনার বাইরে চলে যায়। ঘটনাটি নাটক বা সাজানো বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা হস্তক্ষেপ করায় পরবর্তীকালে ঘটনার আর কোনো বিস্তার ঘটেনি বলে জানান স্থানীয় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কাজী মোসলেম।
হঠাত্ গত বুধবার বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা সংগঠনের প্রতিনিধি দলের প্রধান হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে তার পরিবারসহ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত অসুস্থ থাকায় গত মঙ্গলবার রাতে প্রিয়া সাহা সংগঠনের প্রতিনিধি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। এ খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে পিরোজপুরসহ বাংলাদেশ তথা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
