তিন পুরুষের হঠাত্ দেখা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৯, ১৮:৩৬

 

হিমু, মিসির আলী ও শুভ্র। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট তিন বিখ্যাত চরিত্র। তাদের একসাথে কখনো দেখা হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ তার কোনো লেখায় এই ব্যবস্থা করেননি। যদি তাদের হঠাত্ দেখা হয়ে যায়, তাহলে কী ঘটবে? সেটাই ভেবেছেন আশরাফুল ইসলাম

ধরা যাক, ব্যস্ত রাস্তার পাশে একটা যাত্রী ছাউনি। সেখানে বসে আছে তিন পুরুষ। হিমু, মিসির আলী, শুভ্র। যাত্রী ছাউনিতে সচরাচর সবাই অপেক্ষা করে। তারা কী করছে?

হিমু হাই তুলে শুভ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এই যে ভাই, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। এই বেঞ্চে শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমাব। আপনি একটু চারদিকে খেয়াল রাখেন। রুপাকে দেখতে পেলেই আমাকে ডেকে দেবেন। রুপা আসার আগেই চলে যেতে হবে।’

—রুপা কে ভাই?

—একটা তরুণী মেয়ে। মায়াবতী। নীল রঙের শাড়ি পরে। আমি তাকে পছন্দ করি। কিন্তু তার সাথে কখনো দেখা করি না। দেখা করতে চেয়ে নিজেই হারিয়ে যাই। দেখা হলেই মায়ার জালে আটকা পড়ে যাব। মহাপুরুষদের কোনো মায়া থাকতে নেই।

—আপনি মহাপুরুষ?

—না। তবে আমার বাবা আমাকে মহাপুরুষ বানাতে চেয়েছিলেন। এত কথার দরকার নেই। আপনি খেয়াল রাখেন। আমি ঘুমাই।

—ভাই, খেয়াল তো রাখতে পারব না। আমার চোখ নষ্ট। চশমাটা ব্যাগের ভেতর। ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে। টাকাও ব্যাগের ভেতর। বাসায় যাওয়ার রিকশাভাড়া নেই বলে এখানে বসে আছি। দশ হাত দূরের কিছু দেখছি না। ইস! যদি জরি থাকত! হাত ধরে হাঁটত। কী মজা!

—জরি কে?

—একটা মেয়ে। আমি তাকে পছন্দ করি, সে জানে না। একবার বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে দারুচিনি দ্বীপে গিয়েছিল আমাদের সাথে। মিষ্টি একটা মেয়ে।

—ও। আমি তাহলে ঘুমাই। মাথাটা ধরেছে। দুপুর হলে বিসমিল্লাহ হোটেলে গিয়ে খাব। আপনিও আমার সাথে খাবেন।

—আমি বাইরের খাবার খাই না। বাবা নিষেধ করেছে। যাই হোক, আপনি রাতে ঘুমান না? এখন কেন ঘুমাবেন? রাত জেগে কোপা আমেরিকার খেলা দেখেছেন নাকি? আচ্ছা আপনি আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল?

—ফালতু কথা বলবেন না। মহাপুরুষদের এসব খেলাধুলায় কোনো আগ্রহ নেই। আমার মাথা ধরেছে।

—মাথাটা দেশের সেবায় উত্সর্গ করে দেন।

—কিভাবে উত্সর্গ করব?

—পদ্মা সেতু তৈরি করতে মাথা লাগবে। মানুষের কল্লা। দান করে দেন। দেশবাসী উপকৃত হোক।

—ভাই, আপনি তো মজার মানুষ।

—না, মোটেও মজার না। বন্ধুরা আমাকে বিরক্তিকর ভাবে। কোনো ট্যুরে আমাকে নিতে চায় না। সবাই আমাকে কানাবাবা বলে ডাকে। বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে মজার হলো বল্টু। তার ভালো নাম অয়ন।

 

মিসির আলী এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। তিনি হঠাত্ বলে উঠলেন, ‘তোমাদের দুজনের মধ্যে কে ভ্রমণে আগ্রহী বেশি?’

শুভ্র বলল, ‘আমি প্রচুর বই পড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।’

হিমু বলল, ‘আমার কোনো কিছুতে আগ্রহ নেই। বাস্তব জগতের প্রতি মহাপুরুষদের অতি আগ্রহ থাকতে নেই। এই প্রশ্ন কেন করলেন চাচামিয়া?’

মিসির আলী বলল, ‘আমি একটা তথ্য জানতে সোহাগী স্কুলে যাচ্ছি। আমার সাথে কেউ যাবে কিনা বলো। ভ্রমণসঙ্গী। রানুর বিষয়ে খোঁজখবর নিতে যাচ্ছি। জটিল কেস।’

হিমু বলল, ‘আপনি কি উকিল? আমি তো জানি মক্কেল উকিলের কাছে আসে। টাকাপয়সা দেয়। উকিল কোনো মক্কেলের খোঁজখবর নিতে যায় এটা জানা নেই।’

—বাবা আমি উকিল না। সাইক্রিয়াটিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

—ওহ আচ্ছা। স্যার, আমরা কেউ আপনার সাথে যাব না। আমি এখন চশমাওয়ালা ভাইকে রিকশায় করে বাসায় পৌঁছে দেব। ওনার চোখে সমস্যা। ওনার ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে। এইজন্য আপনি আমাকে কিছু টাকা দেন। দেখছেন তো আমার পাঞ্জাবির পকেট নাই? কাছে টাকাও নাই। ওই ভাই বিপদে আছে।

মিসির আলী সাহেবে একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। পকেট থেকে একটা কুঁচকানো একশ টাকার ময়লা নোট বের করে দিলেন।

 

রাত। মিসির আলী তার খাতা খুলে বসলেন। খাতার মলাটে বড় করে লেখা—অমীমাংসিত রহস্য।

খাতায় লিখতে শুরু করলেন, রহস্যময় এক যুবক। কটকটে হলুদ রঙের পকেটবিহীন পাঞ্জাবি পরে। খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায়। কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই। প্রথম দেখায় মনে হবে নেশাখোর। কিন্তু কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলে জানা যাবে তার মানবিকতা। একটা ছেলের কাছে রিকশাভাড়া টাকা নেই বলে সে নিজে সাহায্য করতে চেয়েছে। বর্তমানে এরকম নিঃস্বার্থভাবে কেউ সাহায্য করে না। সবাই নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের ধান্ধায় ঘোরে। নিঃস্বার্থ পরোপকারের পেছনে এই ছেলের কি কোনো ধান্দা আছে? এটা একটা জটিল রহস্যের বিষয়। প্রকৃতি সব রহস্য কখনো প্রকাশ করে না। কিছু রহস্য থাকুক।