রাফিদুল রাফি
পদ্মাসেতুর জন্য মানুষের কাটা মাথা লাগবে, এমন গুজব যখন চারদিকে বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছে, তখন এই গুজবকে সত্য ভেবে নিয়ে ভয় আর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে আমার বন্ধু নাহিদ। সে বেশ পড়ুয়া আর ভীতু প্রকৃতির ছেলে। আগের দুই তলা মেস ছেড়ে সে কিছুদিন আগেই নতুন এক একতলা টিনশেড মেসে উঠেছে। উদ্দেশ্য সিঙ্গেল রুমে থাকা। রুমে একা না থাকলে নাকি তার পড়া হয় না। তাই এই ব্যবস্থা। তবে রুমে একা থাকতে তার ভয় লাগে। দিনরাত তাই আলো জ্বালিয়ে রাখে সে।
নাহিদের নতুন মেসে আমি দু বার গিয়েছি। তার রুমের জানালা খুলে দিলে একটু দূরে একটা বড় ঝোপঝাড়ের মতো জায়গা দেখা যায়। ওই জায়গাটা বেশ বুনো ও ভুতুড়ে টাইপের। জানালা খুলে ওদিকে তাকালেই নাকি তার ভয় হয়। তাই জানালা খুলে না সে। দিনের বেলায়ও না, আর রাতের বেলায় তো প্রশ্নই আসে না। তো এমন ভীতুর ডিমকে আমরা ভীডি (ভীতুর ডিম) বলেও ডাকি।
পদ্মাসেতুর জন্য মানুষের মাথা কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ফেসবুকে সম্প্রতি এমন গুজব ভাইরাল হওয়ার পর সে আরো বেশি ভয়ে আছে। আগে সে মাঝেমধ্যে বিকেলে আমাদের ক্রিকেট খেলা দেখতে আসত। খেলা শুধু দেখত, খেলত না। যদি বল লাগে শরীরে!
কিছুদিন ধরে তার আর পাত্তা নেই। ভার্সিটির ক্লাস অফ থাকায় তাকে ক্যাম্পাসেও পাই না।
বেশ ক’দিন তার দেখা না পেয়ে আমি আর তৌফিক গেলাম তার মেসে। গিয়ে দেখি তার রুমের দরজা বন্ধ।
কয়েকবার নক করার পর সে দরজা খুলল। আমরা ভিতরে গিয়ে বসার পর বুঝতে পারলাম সে খুব ভয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম তার কী হয়েছে।
সে বলল, ‘আমি এক বাপের এক পোলা। সেতুর জন্য আমার মাথার চাহিদা ব্যাপক। এমন ছেলেদের মাথাই নাকি নিয়া যাইতাছে। আমি কি আর বাঁচুম নারে?’
ব্যাপারটা যে গুজব আমরা দুজন তাকে বুঝাতে চাইলাম।
সে আমাদের কথা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে গলায় একটা মাফলার পেঁচিয়ে ফেলল।
আমরা দুজনে প্রায় একসঙ্গে বললাম, ‘গরমে মাফলার কেন?’
সে জবাব দিল না।
আমরা তাকে বাইরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করলাম। সে যাবে না। পথে যদি কেউ মাথা কেটে নিয়ে যায় তাই!
তৌফিক বলল, ‘মোড়ে নতুন একটা রেস্টুরেন্ট খুলেছে। চল যাই। তোরে ফ্রিতে বার্গার খাওয়ামু।’
অনেক বলার পর সে রাজি হলো। তবে বের হওয়ার আগে সে পাশের রুম থেকে এক বড় ভাইয়ের হেলমেট এনে মাথায় লাগিয়ে নিল।
রেস্টুরেন্টেও হেলমেট পরেই বসে বসে বার্গার খেল। আশপাশের লোকজন হা করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। নিশ্চয় তারা ভাবছে, ‘আজকাল বার্গার খেতেও লোকে হেলমেট পরে!’
খাওয়ার মাঝে তৌফিক একটা সেলফি তুলল।
সেলফিতে আমি, নাহিদ আর তৌফিক। নাহিদ হাতে বার্গার নিয়ে বেশ হাসি হাসি পোজ দিয়েছে। খাওয়া শেষ হলে নাহিদকে বাসায় এগিয়ে দিয়ে এসে আমরা আমাদের নিবাসে চলে গেলাম।
রাতে তৌফিক আমাকে একটা ছবি দেখাল। আমরা রেস্টুরেন্টে যেই সেলফিটা তুলেছি, সে ছবিটাই। তবে ছবিটাতে নাহিদের বডি দেখা গেলেও মাথা নেই। বিশেষ এক সফটওয়্যার দিয়ে তৌফিক নাহিদের কল্লা কেটে দিয়েছে।
এই ছবিটা মাঝরাতে আমরা দুজনে নাহিদকে ইনবক্স করব বলে ঠিক করলাম। উদ্দেশ্য শুধু মজা নেওয়া। কথামতো কাজও করলাম। দুজনেই নাহিদকে ছবিটা পাঠিয়ে লিখলাম, ‘আহারে মাথাটা বাঁচাতে পারলি না। এখন ভূত হয়ে ঘুরছিস কিন্তু বুঝতে পারছিস না। বেটা, কল্লাকাটা ভূত। তুই এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবি স্বপ্নেও ভাবি নাই। তোর আত্মার শান্তি কামনা করি। সেলফিরা মিথ্যা বলে না। তুই যে মরে গেছিস আর তোর কল্লাও কেটে নেওয়া হইছে তা এই সেলফিতেই স্পষ্ট। বেটা ভূত হয়ে ঘুরিস কেন? আমরা কি কিছু বুঝি না? যা উপরে যা। উপরে শান্তিতে থাক।’
এরপর দেখি আমাদের পাঠানো ছবি আর মেসেজ সিন করে রিপ্লাই করেনি নাহিদ। তার বদলে দুজনকেই ব্লক করে দিয়েছে। ভয়ের বদলে রাগ করল কেন ছেলেটা হিসাব মেলাতে পারলাম না। সেদিনকার মতো আমরা দুজন ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে উঠে দেখি বিরাট ঘটনা। এলাকার কান কাটা আজমত ওরফে চিকনা আজমত গুন্ডাকে নিয়ে নাহিদ আমাদের মেসের সামনে হাজির। আমাদের দুজনকে শায়েস্তা করতে শেষমেশ গুন্ডা ভাড়া করে এনেছে!
আমরাও কম যাই না। নাহিদের মাথার দিকে তাকিয়ে আমি আর তৌফিক ‘ভূ... ভূ... ভূ... ভূত! গলাকাটা ভূত!’ বলে চিত্কার করতেই নাহিদ ভয়ে দিল দৌড়। এদিকে কানকাটা আজমত আমাদের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে।
সেও কিছুটা ভীত।
তাকে আরো ভয় দেখানোর জন্য ফোন বের করে আমাদের সঙ্গে নাহিদের মাথাবিহীন সেলফিটা দেখাতেই কানকাটা আজমত দিল দৌড়।
অবশ্য দিন তিনেক পর নাহিদের সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি আমরা দুজন। তবে আমাদের দেখলেই সে বারবার নিজের মাথাটা জায়গা মতো আছে কি না চেক করে নেয়!
বারবার নিজের মাথা হাত দিয়ে ধরে চেক করাটা মুদ্রাদোষে রূপ নিয়েছে তার।
