সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর
যেন আঠার মতো লেগে আছে সে। একটা মেয়ে। সুন্দরী। তবে হিরুর মতে, হাবাগোবা!
অনেকে বলেন, সুন্দরী মেয়েরা সাধারণত একটু বোকাটাইপেরই হয়ে থাকে।
আচ্ছা, এই রুপা মেয়েটাও কি তাই?
হিরু ভেবে কূল পায় না—সুন্দরী মেয়েটি কেন তার পেছনে লেগে আছে! দুনিয়ায় কি পুরুষের অভাব পড়েছে? নাকি সমস্ত বালিকাই ফেয়ার অ্যান্ড আগলি মেখে সুন্দর হয়ে গেছে। সে কারণে আর নির্দিষ্ট কোনো রমণীর পেছনে ছেলেরা লাইন ধরছে না! প্রত্যেকের পেছনে একজন করে। সমবণ্টন!
সেদিন ওপাড়ার হিমু এসে হিরুকে খুব করে চেপে ধরল, ‘হিরু ভাই, তুমি রুপার পথ থেকে সরে দাঁড়াও, প্লিজ।’
হিরু বলল, ‘রুপার পথ থেকে সরে দাঁড়ালে আমি টাউনে যাব কিভাবে?’ উল্লেখ্য, রুপাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়েই হিরুকে টাউনে যেতে হয়!
হিমু আমতা আমতা করে বলল, ‘ওই পথ থেকে নয় ভাই, আমি বলছিলাম কী... ইয়ে মানে ইয়ে...’
হিমু লজ্জা পাচ্ছে। হিরু মুচকি করে হাসল একটু। হিমু ছেলেটাকে বেশ পছন্দ করে ও। সবসময় হলুদ রঙা পকেটবিহীন একটা পাঞ্জাবি পরে ঘুরবে। জগত্-সংসারের প্রতি টান কম। তবে দিলটা অনেক বেশি সফেদ। হিরু হঠাত্ হিমুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কি রুপাকে পছন্দ করো?’
‘কী যে বলো না হিরু ভাই, আমি হিমু। হিমুরা একক কাউকে পছন্দ-অপছন্দ করতে পারে না। তাদের ভালোবাসার মানুষ পুরো পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত!’
‘বাহ!’ হিমুর কথায় হিরু মুগ্ধ। বলল, ‘তুমি ভাই আমার একটা উপকার করো...’
‘কেমন উপকার ভাই?’
‘তুমি রুপাকে ছুটিয়ে নাও। একেবারে আঠার মতো পেছনে লেগে আছে মেয়েটা।’
‘তুমি কোনো জাদু-টাদু করোনি তো হিরু ভাই?’
হিরু স্মিত হেসে বলল, ‘জাদু জানলে তো আমিই ওর থেকে নিজেকে ছুটিয়ে নিতাম। আঠা জুড়তাম কেন?’
হিমু এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, হিরু রুপাকে পছন্দ করে না।
নাকি করে? হিরু বলার পরেও সে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। আসলে নৌকা তীরে থাকলে আমরা তার কদর বুঝতে পারি না। যখন সে কূল ছেড়ে মাঝনদীতে কিংবা ওপাড়ে চলে যায়, তখনই আমরা তার অভাব অনুভব করি। রুপাকে নিয়ে হিমুর অনুভূতিও কি তাই?
‘কী ভাই, উপকার করবে না?’
হিরুর প্রশ্নে হিমু সম্বিত ফিরে পেল। বলল, ‘মুশকিল কি ভাই জানো, সুন্দরী মেয়েরা একবার কারো পিছু লাগলে সহজে আর ছাড়ে না।’
হিরু বিড়বিড় করে বলল, ‘সে কি আমার থেকে আর কেউ ভালো জানে!’
‘তুমি ভাই তার সাথে খারাপ আচরণ করা শুরু করো।’
হিরু মুখ কালো করে বলল, ‘সে কি করিনি ভাবছ। কিন্তু যতই বাড়ে অবহেলা, ততই যেন উছলে ওঠে তার ভালোবাসা!’
‘পাগলামো মার্কা কোনো কর্মকাণ্ড করো।’
‘তাও কম করিনি। কিন্তু আমার পাগলামোগুলো ও খুব মজা করে উপভোগ করে।’
‘তুমি অন্য কোনো নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। মেয়েরা আর যাই করুক না কেন, তাদের প্রিয় মানুষটিকে ভাগ হতে দেবে না!’
‘সে অভিনয়ও কম করিনি। সবই যে চতুরতার সাথে ধরে ফেলেছে!’
‘তাহলে তো ভারী মুশকিল!’
হিমুকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছে। কী কারণ?
হিমু হঠাত্ ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘হিরু ভাই, ওই যে রুপা আসছে। আমি গেলাম।’ আর কোনো কথা না বলে ছেলেটা যেন দৌড়ে ভাগল।
একটু পরে রুপা এসে হিরুর সামনে দাঁড়াল। ‘চলো, কাজী অফিস যাই!’
‘কা-কাজী অ-ফি-স! সেখানে কী? কেন?’
রুপা তার স্বভাবী ও ভুবনভোলানো হাসি হেসে বলল, ‘কাজী অফিসে মানুষ কেন যায়?’
‘না। আমি কাজী অফিস-টফিস যেতে পারব না। তোমার বান্ধবীর বিয়ে তুমিই কাজী অফিসে গিয়ে দাও না। আর খোদ তোমারই যদি বিয়ে করার ইচ্ছে হয়, তাহলে যাও না তুমি। শুধু শুধু আমাকে টানছ কেন?’
রুপা মুচকি হেসে বলল, ‘তুমি ছাড়া বিয়ে হবে কিভাবে?’
‘আ-আমি... বিয়ে...’ হিরু আর কিছু বলতে পারল না। ‘বাঁচাও’ বলে ঝেড়ে একটা দৌড় লাগাল।
যখন হিরু দৌড় থামাল, তখন সে দেখল সে আর চ্যালাপুরে সেই। কেতুপুর চলে এসেছে। এক মাঝারি আকৃতির চোখে ডাটি চশমা পরিহিত ব্যক্তি ছাড়া আশপাশে আর কারোর দেখা পেল না ও। ধীরপদে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও।
‘বেশ পেরেশানে আছ, তাই না?’
হিরু অবাক। ভদ্রলোকটি তার মনের কথা জানে? কিভাবে? জাদুকর নাকি?
হিরু তাঁকে সবকিছু খুলে বলল। সব শুনে তিনি বললেন, ‘তোমার কি মনে হয় মেয়েটা তোমার জন্য পাগল?’
হিরু ইতস্তত বলল, ‘না।’
ভদ্রলোক চমকে উঠলেন। সাধারণত মানুষকে চমকে দেওয়া তার স্বভাব হলেও আজ হিরুর কথায় তিনি নিজেই চমকে গেছেন। ‘কিভাবে বুঝলে?’
হিরু সরাসরি জবাব দিল না। ‘আমার মনে হয়, ওই বালিকা ওই ছেলেটিকে পছন্দ করে। কিন্তু বলতে পারছে না।’
‘আচ্ছা। আর ওই ছেলেটি?’
‘ছেলেটিও...’
‘তাহলে ওদের মধ্যে প্রেম হচ্ছে না কেন?’ ভদ্রলোক মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন।
হিরু দ্বিধান্বিত। কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না ও।
ভদ্রলোক ফের মুচকি হেসে বললেন, ‘ওই দুই বালক-বালিকা আমার গল্পেরই ক্যারেক্টার! ওদেরকে এক করা, না-করার দায়ভার তুমি আমার ওপরে ছেড়ে দাও। এখন একটা কথা বলো তো...’
‘জি, বলুন।’
‘রুপার মতো এত সুন্দর আর স্মার্ট একটা মেয়ে তোমার পেছনে এভাবে অভিনয় করল, তবুও তোমার মন গলল না কেন?’
‘আমি জানতাম।’
‘কী জানতে?’
‘রুপা আমাকে পছন্দ করে না।’
‘কিভাবে জানলে?’
‘পরে কোনো একদিন বলি?’
ব্যাপারটা আর কখনোই তাঁকে বলা হয়নি। তিনি ওপাড়ে চলে গেছেন। হিরু-রুপার ব্যাপারে কোনো মীমাংসা না করেই। এরপর একে একে সাত সাতটি বছর কেটে গেছে। সেদিন হিমুর সঙ্গে দেখা হলো ওর। সেই আগের মতোই আছে। নতুন কোনো কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারছে না বলে একটু যেন মনমরা। এর ঠিক দুদিন পরে রুপার সঙ্গে ওর দেখা হলো।
মেয়েটা মুখ কালা করে বলল, ‘সেদিন তুমি আমার সাথে কাজী অফিসে গেলা না!’
হিরু কিছু না বলে চুপ করে রইল।
‘সেদিন বেটাকে খাপমতো পেয়েছিলাম। দরকার ছিল একজন সাক্ষীর। ভাবলাম, তোমাকেই সাক্ষী বানাব। তুমি রাজি থাকলে ওর আর আমার ইয়েটা হয়ে যেত...’
হিরু চমকে ওঠে। কী ভুলটাই না ও করেছে সেদিন...। নাকি এটাই নিয়তি?
হিরু জানে রুপা এখন অনেকটাই আপসেট। ওর মানসিক অবস্থার বদল দরকার। হিমুকে নিয়ে টেনশন নেই। ও মচকাবে তবু ভাঙবে না। কাউকে ভালোবেসে যাবে, কিন্তু মুখ ফুটে বলবে না। কিন্তু এই সুন্দরী মেয়েটা...।
পকেট থেকে মোবাইল বের করে হিরু রুপাকে একটা ছবি দেখাল। ‘এটা শ্রীদেবী।’
‘কী বলো, ক’দিন আগেই না মারা গেলেন উনি। তখন তো এতটা বুড়ো হননি।’
হিরু আরেকটা ছবি দেখিয়ে বলল, ‘এটাকে দেখো—বিদ্যা ভারতী।’
‘কী যা-তা বলছ হিরু ভাই। বিদ্যা ভারতী কত্ত সুন্দরী ছিলেন। অল্প বয়সে মারা গেলেন। তাঁকে বৃদ্ধা পেলে কখন?’
হিরু রুপার কথার জবাব না দিয়ে আরেকটা ছবি দেখাল, ‘এই দেখো সুচিত্রা সেন।’
‘এটা সুচিত্রা সেন! তোমার কি মাথা খারাপ হলো হিরু ভাই? সুচিত্রা সেন এতটা বুড়ি?’
‘আর এই দেখো...’
‘এটা কে?’
‘এটা তুমি!’
‘আমি মানে? আমি তো খোদ তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে।’
হিরু মুচকি করে একটু হেসে বলল, ‘ছবিগুলো ফেসঅ্যাপের মাধ্যমে এডিট করা। বয়স্ক ভার্সন। যাদের ছবি দেখালাম, তারা সবাই একটা জায়গায় নিজেদের বয়সটাকে আটকে রেখেছেন। তুমিও তাদের একজন। ফেসঅ্যাপে তাদেরকে যেমন দেখাচ্ছে—বাস্তবে তারা বুড়ো হলে এরচেয়েও থুরথুরে হয়ে যেতেন কিংবা বয়সের তুলনায় এখনো ইয়ং থাকতেন!’
রুপা চুপ করে রইল।
হিরু বলে চলল, ‘এটাই প্রকৃতির লিখন। প্রকৃতি কিছু রহস্য তার মতো করে অমীমাংসিত অবস্থায় রেখে দেয়। তোমার আর হিমুর জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। বিদায়।’ g
[১৯ জুলাই ছিল হিমু-রুপার স্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রইল আমাদের এই আয়োজন।]
