ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ এলাকায় জিরো ফার মানে বালু ভরাটের পায়তারা: স্থপতি সাঈদ

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৫, ১৪:০৮

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেছেন, আমাদের নগরের উন্নয়ন যেন দস্যুদের কাছে জিম্মি। তারা দিনরাত নদীনালা-খালবিলে বালু ভরাট করছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) ফ্লাড ফ্লো এরিয়া বা বন্যাপ্রবাহের এলাকায় জিরো ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে—বিল্ডিং বানানো যাবে না, কিন্তু বলা নেই ভরাট করা যাবে না। অর্থাৎ ড্যাপে এই জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি। এর মানে, এখন বালু ভরাটের পায়তারা হবে, আগামীতে সেসব জায়গায় ভবনও তৈরি হবে। এতে করে দস্যু-দখলদাররাই লাভবান হবে।

শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের হলরুমে বাংলাদেশ পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট নামের নতুন একটি পেশাজীবী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।

‘জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এই সেমিনারে স্থপতি সাঈদ বলেন, আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়াটার ক্যাচমেন্ট এরিয়া। অ্যামাজন হচ্ছে লংগেস্ট (দীর্ঘতম), আমরা লার্জেস্ট (বৃহত্তম)। আদিকাল থেকেই আমাদের এই অঞ্চলে উজান থেকে পানি নেমে আসে। এই পানিকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এমনকি ইন্দাস ভ্যালি সিভিলাইজেশনের সঙ্গেও আমাদের সংযোগ ছিল বিধায় আমরা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিলাম।

তিনি আরও বলেন, ইবনে বতুতা সোনারগাঁওয়ে নদীর তীর দেখে এটিকে মিশরের নীল নদের তীরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অথচ সেই নদীর আজকের দশা দেখুন। দূষণ-দখলে এটি বিবর্ণ হয়ে গেছে।

স্থাপত্য ইতিহাসবিদ ও গবেষক ড. সাঈদ আরও বলেন, পরিবেশকে জানা-বোঝা ও অতীত ইতিহাসের আলোকে উন্নয়ন করা উচিত। আমাদের রাজধানী ঢাকায় একসময় জলাভূমির অসাধারণ নেটওয়ার্ক ছিল। ইউরোপের শহরগুলোতে দেখবেন, সেখানে সড়কপথে গাড়ি চলে, উপরে মেট্রোরেল চলে, আবার পানিপথেও শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যাওয়া যায়। ঢাকার ক্ষেত্রে প্রকৃতিপ্রদত্ত সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, জলকেন্দ্রিক এই নেটওয়ার্ক সচল থাকলে আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা বহুমাত্রিক হতো, অসংখ্য মানুষের চলাচলে সুবিধা হতো। আজকে যে জনঘনত্বকে এই শহরের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেই সংকট তৈরি হয়েছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও দখলদারিত্বের কারণেই।

স্থপতি সাঈদ আরও বলেন, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে। জনঘনত্বকে সংকট হিসেবে না দেখে সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অংশীদারিত্বমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে মানবিক, ন্যায্য ও সুন্দর নগর গড়া সম্ভব। এখনো সেই সময় ফুরিয়ে যায়নি।

পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার বার্তা দিয়ে স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি আরও বলেন, মেহগনি গাছ আমাদের গাছ না। কিন্তু আমরা এই গাছ থেকে পাওয়া কাঠ ব্যাপক পরিমাণে ব্যবহার করি। আমাদের গাছ হচ্ছে শাল, জারুল, এবং বাঁশ। বাঁশকে কীভাবে একটি নির্মাণ উপকরণ হিসেবে বহুলভাবে কাজে লাগানো যায়, সে ব্যাপারে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। বিদেশি গ্রিন বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে গিয়ে বিশেষধরনের গ্লাস বা উপকরণ আমদানি করারও প্রয়োজন নেই, বরং আমরা দেশজ উপকরণ ব্যবহারেই জোর দিতে পারি।

পরিবেশবান্ধব স্থাপনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আহসান মঞ্জিল দেখুন, দুই ধারে বারান্দা। খনার বচনের মতো দক্ষিণমুখী ভবন। দক্ষিণের বাতাস বারান্দার ছায়ায় ঠাণ্ডা হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। এটিই এ দেশের চিরায়ত স্থাপত্য। ভিনদেশি অনেক স্থপতি এ দেশে এসেও তাদের কাজে এর প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কুমিল্লার বার্ডসহ অনেক জায়গায় সেই উদাহরণ দেখা যায়। মোট কথা, আমাদের প্রচুর গবেষণা করতে হবে, নিজেদের জন্য উপযোগী সবুজ ও টেকসই স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়নে নজর দিতে হবে।

সেমিনারে আলোচক হিসেবে আরও বক্তব্য দেন সাবেক সচিব ও রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ, লিডিং ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য স্থপতি অধ্যাপক ড. কাজী আজিজুল মওলা, পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সভাপতি প্রকৌশলী-পরিবেশবিদ খোরশেদ আলম, হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা স্থপতি মো. নাফিজুর রহমান এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের চিফ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার ড. এ এস এম ওবায়দুল্লাহ মাহমুদ।

পরিবেশবিষয়ক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন নোবিপ্রবির সহকারী অধ্যাপক ড. আফসানা পারভীন শহীদ, গবেষক মো. কৌশিক আহমেদ, শিক্ষার্থী অপ্সরা ইসলাম তন্দ্রা ও এহসানুল হক চৌধুরী। আলোচনা সঞ্চালনা করেন পরিবেশবিদ শাহ ইসরাত আজমেরি ও স্থপতি-পরিবেশবিদ মাহমুদুর রহমান পাপন। সেমিনারে মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক ইত্তেফাক।

ইত্তেফাক/এসটিএম/এসএএস