বিশ্ব ধরিত্রী দিবসকে উপলক্ষ করে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, নগরবিদ, পরিবেশবিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞসহ সমমনা পেশাজীবিদের নিয়ে সেমিনার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট (বিআইই)।
শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের হলরুমে ‘জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এই সেমিনার আয়োজন করা হয়। গত ২২ এপ্রিল ছিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে প্রতিবছর এ দিনটি ধরিত্রী দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।
পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সেমিনারে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ, সাবেক সচিব ও রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী-পরিবেশবিদ ড. সুলতান আহমেদ, লিডিং ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য স্থপতি অধ্যাপক ড. কাজী আজিজুল মওলা, হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা স্থপতি-পরিবেশবিদ মো. নাফিজুর রহমান এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের চিফ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার ড. এ এস এম ওবায়দুল্লাহ মাহমুদ। তারা তাদের বক্তব্যে পরিবেশের প্রতি সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা অবলম্বনের আহবান জানান। এছাড়া আয়োজনে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সভাপতি প্রকৌশলী-পরিবেশবিদ খোরশেদ আলম।
স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, পরিবেশকে জানা ও বোঝা এবং অতীত ইতিহাসের আলোকে উন্নয়ন করা উচিত। আমাদের রাজধানী ঢাকায় একসময় জলাভূমির অসাধারণ নেটওয়ার্ক ছিল। ইউরোপের শহরগুলোতে দেখবেন, সেখানে সড়কপথে গাড়ি চলে, ওপরে মেট্রোরেল চলে, আবার পানিপথেও শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যাওয়া যায়। ঢাকার ক্ষেত্রে প্রকৃতিপ্রদত্ত সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা নষ্ট হয়ে গেছে। জলকেন্দ্রিক এই নেটওয়ার্ক সচল থাকলে আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা বহুমাত্রিক হতো, আমরা যানজটে কষ্ট পেতাম না। তবে অনেক সংকট থাকলেও অংশীদারিত্বভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এখনো মানবিক, ন্যায্য ও সুন্দর নগর গড়া সম্ভব। সেই সময় ফুরিয়ে যায়নি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় বন্যাপ্রবাহ এলাকাকে জিরো ফার দেওয়া হয়েছে, সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে দেখানো হয়নি। ড্যাপের এ সকল ফাঁকফোকরের কারণে ভূমিদস্যুরা খালবিলে বালু ভরাট করে জায়গা দখলের সুযোগ পাবে, যেখানে হয়তো পরবর্তীতে ভবনও তৈরি হবে। এই ড্যাপ সংশোধন করা জরুরি।
সাবেক সচিব ও রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ বলেন, পরিকল্পনা ও যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সংবেদনশীলতা অবলম্বন করা উচিত। স্থপতি আবু সাঈদের বক্তব্যের সূত্র ধরে বন্যাপ্রবাহ এলাকায় জিরো ফার দেওয়ার বিষয়টির সমালোচনা করেন তিনি। এছাড়া কেবল ঢাকা নয়, সারাদেশের প্রতিটি এলাকার পরিবেশ নিয়েই ভাবার ওপর জোর দেন তিনি।
লিডিং ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য ও বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. কাজী আজিজুল মওলা বলেন, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সময়কালের জন্য প্রণীত ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং বা ডিএমডিপি স্ট্রাকচার প্ল্যানে জলাভূমি সংরক্ষণ, ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ঢাকা সে অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে সময়ের সাথে সাথে ঢাকার খালগুলোও হারিয়ে গেছে৷ খাল ও জলাভূমির নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারের কোনো প্রস্তাবনাই বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ বাংলাদেশে যেকোনো টেকসই সেটেলমেন্ট প্ল্যানিংয়ের জন্য যথাযথ পানি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। সব শহর-নগর বিনির্মাণে এটি মাথায় রাখতে হবে।
হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা স্থপতি-পরিবেশবিদ মো. নাফিজুর রহমান গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন সম্পর্কে কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্টিফিকেশন, স্রেডার বীর বা বিল্ডিং এনার্জি এফিশিয়েন্সি রেটিং পদ্ধতি এবং এইচবিআরআই-এর গ্রিন-আর্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। নাফিজ বলেন, পরিবেশবিদদের কাজ বাড়ছে। নানা ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।
বার্জারের চিফ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার ড. এ এস এম ওবায়দুল্লাহ মাহমুদ বলেন, আমরা এমন রঙ নিয়ে গবেষণা করছি যেটি ক্ষতিকর গ্রিন হাউজ গ্যাসকে শুষে নেবে। বাতাসে থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ টেনে নেবে দেয়ালের রঙ। এধরনের পণ্য তৈরি করে আমরা সফল হয়েছি। এমন আরও অনেক বিষয়ে গবেষণা চলছে। স্থাপনা নির্মাণের সময় এমন আনুষাঙ্গিক অনেক বিষয়ে লক্ষ্য রাখা যেতে পারে, যেটি ছোট পরিসরে হলেও পরিবেশের জন্য ভালো ভূমিকা রাখবে।
এরপর পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সভাপতি প্রকৌশলী-পরিবেশবিদ খোরশেদ আলম সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং আলোচকদের হাতে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন।
সেমিনারে পরিবেশবিষয়ক গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন নোবিপ্রবির সহকারী অধ্যাপক পরিবেশবিদ ড. আফসানা পারভীন শহীদ, পরিবেশবিদ মো. কৌশিক আহমেদ, শিক্ষার্থী অপ্সরা ইসলাম তন্দ্রা ও এহসানুল হক চৌধুরী। পুরো আলোচনা সঞ্চালনা করেন পরিবেশবিদ শাহ ইসরাত আজমেরি ও স্থপতি-পরিবেশবিদ মাহমুদুর রহমান পাপন। আয়োজনে মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। এছাড়া স্পন্সর ছিল বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড। কো-স্পন্সর হিসেবে ছিল আরএকে সিরামিকস, জেইএম কনসালট্যান্টস লিমিটেড, বরাল কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড, তিলোত্তমা গ্রুপের নেক্সট ব্লক এএসি, গ্রাসহোপার গ্রুপ অব কোম্পানিজ, বেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং মাফ ক্রাফট।
প্রসঙ্গত, পরিবেশ বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যাদের অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি রয়েছে, তাদের নিয়ে ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করে পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট। এর আগেও বিভিন্ন কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন করেছে সংগঠনটি।

ড্যাপে বন্যাপ্রবাহ এলাকায় জিরো ফার মানে বালু ভরাটের পায়তারা: স্থপতি সাঈদ