চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকার মেঘনায় প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে ২০০২ সালের ৩ মে ডুবে যায় এমভি সালাহউদ্দিন-২ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ। দক্ষিণাঞ্চলগামী পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীগামী এ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ভোলা ও পটুয়াখালীর ৩৬৩ জন যাত্রী মারা যায়।
উদ্ধার অভিযান শেষ হয়ে যাওয়ার পর মেঘনা নদীর ষাটনল, ছটাকি, ষাটনল মালোপাড়া, দশানী, মোহনপুর ও এখলাছপুর অঞ্চলে ৩৬টি লাশ পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রশাসন সেই লাশগুলো উদ্ধার করে ষাটনল লঞ্চ দুর্ঘটনা কবলিত অঞ্চলে গণকবর হিসেবে দাফন করা হয়। লাশ খুঁজে না পাওয়া স্বজনরা এখনো এইদিনে এই ষাটনল গণকবরে ছুটে আসছেন এবং স্বজনের লাশ এখানে আছে বিশ্বাস করে দোয়া করে যান।
৩ মে শনিবার বেলা ২টার দিকে ষাটনলের সালাউদ্দিন-২ লঞ্চডুবির এই গণকবরে প্রিয়জনের লাশ এখানে সমাহিত আছে বিশ্বাসে দোয়া করতে আসেন রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা'র ফিরোজ আহমেদ, আব্দুল আলী, রমিজ উদ্দিন ও ফজলে আবেদ। তাদের কর্মস্থল ঢাকা, সেখান থেকেই প্রিয়জনের কবরের পাশে দোয়া করার জন্য এসেছেন তারা।
ষাটনলে ভয়াবহ সেই সালাউদ্দিন-২ লঞ্চ ডুবির ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিভীষিকাময় দৃশ্য আজও ভেসে ওঠে এখানকার মানুষের মনে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, দশমিনা ও গলাচিপা এলাকার মানুষের হৃদয়ে আজো গভীর শোকের দিন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ২০০২ সালের ৩ মে।
এদিন মধ্যরাতে ঢাকা থেকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীগামী ‘এমভি সালাউদ্দিন-২’ লঞ্চটি ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে মেঘনা নদীতে ডুবে যায়। লঞ্চে প্রায় ৪৫০-৫০০ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে যাত্রী বোঝাই করে লঞ্চটি যাত্রা শুরু করে। অথচ ছিল না নিরাপত্তা ব্যবস্থা; পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও উদ্ধার সামগ্রী।
ভয়াবহ সেই সালাউদ্দিন-২ লঞ্চ ডুবিতে অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। আর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন রাঙ্গাবালী, গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার সাধারণ মানুষ। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ জীবিকার খোঁজে ঢাকায় গিয়েছিলেন।
লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর উদ্ধার তৎপরতা ছিল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। নদী থেকে লঞ্চটি তুলতে চেষ্টা করা হয়েছিল। কপিকলের ভারী শিকলে লঞ্চটি তোলার দৃশ্যটি ছিল যেন একটি বিভীষিকা। এক পাশে হাজারো চোখ। যারা হারানো প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজছিল, আর অন্যপাশে বিস্ময়ের মধ্যে বিভীষিকার বাস্তবতা দেখছিল।
ওই লঞ্চে যাত্রী ছিলেন রাঙ্গাবালীর ফিরোজ আহমেদ। ২৩ বছর পর সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আজও তার মনে দাগ কেটে আছে। তিনি জানান, সেদিন লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর পানিতে সাঁতরাচ্ছিলাম, অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। ছোট একটুকরো কলাগাছের সাহায্যে আমি নদীর তীরে পৌঁছাই। কিন্তু যারা মারা গেছে, তাদের পরিবারের শোক কখনও ভুলতে পারব না।
দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে। বলা হয়, লঞ্চটি অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এবং জীর্ণ ছিল। তবে দুদশক পেরিয়ে গেলেও এই দুর্ঘটনার জন্য আজও শাস্তি হয়নি কারও।
