কুড়িগ্রামে এখনো পানিবন্দি সাড়ে আট লাখ মানুষ

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৩

দেশের কিছু কিছু স্থানে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। আবার কোন কোন স্থানে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। কুড়িগ্রামে এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে সাড়ে আট লাখ মানুষ। জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে ২ জন ও টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বন্যার পানিতে ডুবে এক শিশু মারা গেছে। 

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রাম জেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা যায়, জেলার ৫৭টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। ফসলী জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ হাজার হেক্টর। বন্যায় এক হাজার ২৪৫ কিলোমিটার রাস্তা, ৪০ কিলোমিটার বাঁধ ও ৪১টি ব্রিজ/কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।  নলকুপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯ হাজার ৭৩৪টি। শনিবার বিকালে ব্রহ্মপূত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৮০ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে ৮৩.৪৫ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদীর পানি ব্রিজ পয়েন্টে ৪৫ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার প্রায় পুরোটাই বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। লক্ষাধিক মানুষ দেড় সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্যার্ত মানুষেরা ঘরবাড়ি ছেড়ে কুড়িগ্রাম, রংপুর ও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাড়ি জমাচ্ছে। উপজেলার এমন কোন বাড়ি নেই যেখানে বন্যার পানি ওঠেনি। বিশুদ্ধ পানি ও গো খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

জামালপুরে ২ জনের মৃত্যু

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলাক্ষিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কুশলনগর গ্রামের হামিদুল ইসলামের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলে রাহাত (১০) শনিবার বেলা ১১টার দিকে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। একই দিন দুপুরে জামালপুর সদরের তিতপল্লা ইউনিয়নের তিতপল্লা গ্রামে বন্যার পানি দেখতে  গিয়ে কেন্দুয়া ইউনিয়নের ফারুক গাজীর ছেলে মো. সিফাত (১৬) পানিতে ডুবে মারা যায়। এদিকে জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। শনিবার বেলা ৩টার দিকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে পানি ৩৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ১৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে জামালপুরের ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯ শ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার হিসেবে ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন।  ইসলামপুরে ত্রাণ বিতরণ করেন সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপি, স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ ফরিদুল হক খান দুলাল প্রমুখ।

 

নাগরপুরে শিশুর মৃত্যু

নাগরপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, যমুনা-ধলেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। উপজেলা ত্রাণ ও দূর্যোগ অফিসের তথ্যমতে, বন্যায় নাগরপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রাম প্ল­াবিত হয়েছে। অন্তত ৫০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার কলমাইদে বন্যার পানিতে ডুবে কলমাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাকিবুলের মৃত্যু হয়েছে। সে কলমাইদ গ্রামের আমিনুরের ছেলে।

শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধির ফলে শেরপুর সদর, শ্রীবরদী ও নকলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৩৫ গ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। এসব এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শনিবার সকালে শেরপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে সবজি ভাণ্ডার খ্যাত শেরপুরের চরাঞ্চলের সবজি ক্ষেত ও বীজতলা। পানির তোড়ে পাড় ভেঙে ভেসে গেছে দুই শতাধিক পুকুরের প্রায় দুই কোটি টাকার মত্স্য সম্পদ। জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল রউফ জানান, বন্যা দুর্গতদের মাঝে ৩৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জে বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপরে যমুনার পানি

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শনিবার ভোর ৬টা নাগাদ আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানির স্তর পরিমাপকারী ফারুক হোসেন এ তথ্য জানান। পানি বেড়েছে পদ্মা নদীতেও। উত্তাল পদ্মায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গতকাল পারাপারের অপেক্ষায় ছিল চার শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ও দুই শতাধিক বাস। যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভাঙন। দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে  তিন শতাধিক পরিবার। মানিকগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বাবুল মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙন কবলিত মানুষের মধ্যে ৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় তিন হাজার পরিবার।  ইউপি চেয়ারম্যানরা বলেন, বন্যার্ত মানুষের মাঝে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন সুলতানা জানান, শুক্রবার গাজিরটেক ইউনিয়নে মৈজদ্দিন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া ৪০ পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পানিবন্দি পরিবারগুলোর সঠিক তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। তালিকাশেষে ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবারের মাঝে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা ও  আড়িয়াল খাঁ নদে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে ও নদী ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলেও নদী ভাঙন রোধ করতে পারছে না। গত এক সপ্তাহে উপজেলার চর মানাইড় ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে জাজিরা কান্দি, আদিলউদ্দীন মোল্যা কান্দি, আমির খাঁ খান্দি, কালাই মাতুব্বরের কান্দি গ্রামের গাছপালা, ফসলি জমি, শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

সাঘাটায় ডেপুটি স্পিকারের ত্রাণ বিতরণ

সাঘাটা (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, সাঘাটা উপজেলার বন্যা কবলিতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি। শনিবার তিনি জুমারবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১ হাজার পরিবারের মাঝে  ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করেন। এছাড়াও ডেপুটি স্পিকার উপজেলার ঘুড়িদহ, হলদিয়া, জুমারবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে বন্যার্তদের মাঝেও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। এসময় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবীর, উপজেলা নির্বাহী অফিসার উজ্জল কুমার ঘোষ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শরীয়তপুরে বেড়েছে পদ্মার পানি

শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, সেখানে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি ওঠার কারনে নড়িয়া-জাজিরা সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ওই সড়কের পাচুখার কান্দি এলাকায় বিকল্প সড়ক ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। বিকল্প সড়কটি ভেঙ্গে যাওয়ায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত দশ দিনে পদ্মা নদীতে ১৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নড়িয়ার মোক্তারের চর, চরআত্রা, নওপারা, জাজিরার বিলাশপুর, বড়কান্দি, পালেরচর, ভেদরগঞ্জের কাচিকাটা, তারাবুনিয়া ইউনিয়নে নদী তীরবর্তি কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।