বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার নালিশে দেশজুড়ে জনক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ঘটনায় চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসুবক, টুইটার ও ব্লগগুলোতে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে, চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেউ কেউ এই ঘটনার পেছনে বড় কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার দাবিতে গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে তাঁর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করেছে সংক্ষুব্ধরা।
অন্যদিকে পিরোজপুরের স্থানীয় জনগণ প্রিয়া সাহার এই নালিশকে উসকানিমূলক বলে উল্লেখ করেছেন। স্থানীয় হিন্দু সমপ্রদায়ের কয়েকজনের ভাষ্য, প্রিয়া তাঁর ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমানকে হয়রানি করে আসছেন। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অমূল্য রঞ্জন হালদার বলছেন, প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন তা তার নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য এবং উসকানিমূলক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিরোজপুরের এক এনজিও কর্মী বলেন, হয়তো নিজের মেয়েদের গ্রিনকার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এ সব ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। এদিকে গতকাল ওয়াশিংটনে যোগাযোগ করে জানা গেছে, বাংলাদেশ কমিউনিটি গত বৃহস্পতিবারের পর থেকে প্রিয়া সাহাকে খুঁজে পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহূত তাঁর মোবাইল নম্বরটি বন্ধ রয়েছে। আবাসিক ঠিকানাতেও তিনি নেই।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাশগুপ্ত বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে প্রিয়া সাহার নালিশ একেবারেই তার নিজস্ব। সংগঠন থেকে যে তিনজন প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে সেখানে তার নাম নেই। যাদের পাঠানো হয়েছে তারা হলেন, পরিষদের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অশোক বড়ুয়া ও নির্মল রোজারিও এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জী। এর বাইরে আমাদের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। প্রিয়া সাহা আমাদের সংগঠনের ১১ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের একজন। তবে তিনি ওই প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন না। তিনি আরো জানান, প্রিয়া যে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন, তা তিনি শুক্রবার গণমাধ্যম থেকে জেনেছেন।
তবে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ওয়াশিংটনের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের ২৭ প্রতিনিধির যে তালিকা প্রকাশ হয়েছে সেই তালিকায় ১৮ নম্বরে প্রিয়া বিশ্বাস সাহার নাম রয়েছে। গত বুধবার হোয়াইট হাউসে এই ২৭ জন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন।
বর্তমানে পিরোজপুরে অবস্থানরত গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘বাংলাদেশ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ। এখানে কেউ ধর্মীয় বিবেচনায় নির্যাতনের শিকার হন না। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মুসলমান-হিন্দুরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নাজিরপুরে হিন্দু বা অন্য কোনো সমপ্রদায়ের লোক গুম বা নিখোঁজ হয়নি। প্রিয়া বালার বক্তব্য অসত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সামপ্রদায়িক সম্পর্ক নষ্টের উসকানিমূলক অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
প্রিয়া সাহার ওই অভিযোগের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম তাঁর ফেসবুকে লিখেছন, ‘ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ। অনেকেই ব্যক্তি স্বার্থে বা না বুঝে এটার ক্ষতি করে ফেলেন। সবার উচিত এই ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা। প্রিয়া সাহা কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। তার অভিযোগগুলোও সরকার শুনবে এবং খতিয়ে দেখবে।’
গতকাল শনিবারর দুপুরে ধানমন্ডিতে প্রিয়া সাহার বাড়ির সামনে ‘সচেতন ছাত্র সমাজ’ ব্যানারে একদল যুবক মানববন্ধন করেছেন। মানববন্ধনের পর তারা প্রিয়া সাহার বাসায় তালা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও পরে তা আর করেননি। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আব্দুল কাইয়ুম নামে এক শিক্ষানবীশ আইনজীবী বলেন, ‘প্রিয়া সাহা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। তিনি সংখ্যালঘুদের কথা চিন্তা করে নয়, বরং তার যে দুই মেয়ে আমেরিকা প্রবাসী তাদের নাগরিকত্ব পেতে ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেছেন।’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শুভ অধিকার নামে আরেকজন বলেন, ‘বাংলাদেশ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ। আমরা সব ধর্মের লোক মিলেমিশে বসবাস করছি। ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু খুন ও গুমের যে তথ্য দিয়ে প্রিয়া সাহা ট্রাম্পের কাছে নালিশ করেছেন, তা আমরা মানতে পারিনি। তাই আমাদের অবস্থান জানাতে তাঁর বাসার সামনে দাঁড়িয়েছি।’
অন্যদিকে ট্রাম্পের কাছে দেশবিরোধী ও সামপ্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় প্রিয়া সাহাকে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ‘ফিউচার অফ বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়। ওই মানবন্ধনে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ আন্দোলনের সভাপতি কেএম রকিবুল ইসলাম রিপন বলেন, ‘বহির্বিশ্বে এমন ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অপরাধে প্রিয়া সাহার নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি করছি।’
