বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির শহর

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৯, ১৯:৪৫

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির পুরান ঢাকা। এরমাঝেই এখানে আছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, বিরিয়ানি, বাকরখানিসহ রসনা তৃপ্তিকারী নানা খাবার। তামা, কাসা, শঙ্খের মতো হস্ত ও কুটিরশিল্প। গলি কিংবা রাস্তায় চলে ঐতিহ্যের ঘোড়ার গাড়ি, জনপ্রিয় বাহন রিকশা কিংবা গলি থেকে পা ফেললেই দেখা মেলে শতশত নৌযান। এতসব ঐশ্বর্য আর কোনো শহরে আছে তা বলতে গেলে ভাবতে তো হবে বটেই!

এই শহরের আছে ৪০০ বছরের ঐতিহ্য। এটা যেন একটি ধুলোয় মাখা বই। এখানকার হোটেল, রেস্তোরাঁ, রিকশা, প্রধান পেশা ব্যবসা, সাদা লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, বিরিয়ানি-বোরহানি, রসালো পান, মুখের বুলি—সব কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যায় ঐতিহ্যের ছোঁয়া। বেশ কয়েকদিন দু-পায়ে চষে বেড়িয়েও মনে হলো এখনো তো অনেককিছুই দেখার বাকি! ‘পদব্রজে পুরান ঢাকা’ শিরোনামের একটি গল্প তখনই লেখা যাবে যখন বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলিতে নিজের পদচিহ্ন পড়বে ঠিকঠাক! এবারের ছোট ছোট কিছু অভিজ্ঞতার কথা থাকলো এই আয়োজনে—

ফরাসিদের আস্তানা যখন পুরান ঢাকা

ফরাশগঞ্জের নাম অনেকেরই জানা। অনেকে গিয়ে হয়তো হলুদ, আদা, রসুন, মরিচ, পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধটা সহ্যও করে এসেছেন। ১৭৮০ সাল থেকেই এই এলাকার বাতাসের সঙ্গে মিশে আছে বিভিন্ন মসলার গন্ধ। এই বাজারটি চালু করেছেন ফরাসি বণিকরা। কিভাবে তাঁরা এলেন? মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে! ১৭৫০ সালের দিকে ব্রিটিশদের মালিকাধীন একটি কারখানা দখল নিয়ে ছোটখাটো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ফরাসি বণিকদের দল। তারপরের ১০ বছরে জায়গাটি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় তাঁরা। জায়গার নাম হয়ে যায় ফ্রেন্সগঞ্জ। তাঁরাই সর্বপ্রথম এখানে মসলার পাইকারি বাজার প্রতিষ্ঠিত করেন, যা আজও চলমান। আর সেই ফরাশগঞ্জ বাজারেই তো দাঁড়িয়ে আছে ফরাসিদের এককালের স্মৃতি রুপলাল হাউজ।

রুপলাল হাউজের কথা উঠলে রুপলাল দাশ, রঘুনাথ দাশ বাবুদের কথাও চলে আসে। কিন্তু ক’জন জানে সে ইতিহাস? হয়তো একদিন থাকবে না অপরূপ বাড়িটাও। কারণ এটি এখন পরিত্যক্ত, খসে পড়ছে এর সৌন্দর্য। অথচ ১৮ শতকে ঢাকা শহরে নাচঘর বা বলরুম ছিল শুধু আহসান মঞ্জিল আর রুপলাল হাউজে। ১৮৮৮ সালে কোনো এক সময় লর্ড ডাফরিন ঢাকায় আসেন। তাঁর সম্মানে নাচ-গানের আসর বসবে এই নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামে ঢাকার নবাব আর রুপলাল বাবুরা। অনেকেই হয়তো জানেন ঢাকার নবাব আর রুপলাল বাবুদের মাঝে একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ সব সময় লেগে থাকতো। সেসময় অনেক বেশি ভোটে বিজয়ী হয় রুপলাল হাউজ। তবে এখন পান-মসলার আঁড়তের ভিড়ে হারিয়ে গেছে তার পুরোনো আধিপত্য।

ফরাশগঞ্জের কথা বললেই বিবিকা রওজা ও হোসনি দালানের কথা উঠে আসবেই। ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো ইমামবাড়া হচ্ছে ‘বিবিকা রওজা’। যা নির্মিত হয় ১৬০০ সালে। প্রতিবছর এই ‘বিবিকা রওজা’ থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বের করেন বিশাল তাজিয়া মিছিল। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আশুরার আনুষ্ঠানিকতা। বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৬৪২ সালে সুলতান সুজার শাসনামলে মীর মুরাদ হোসনি দালান প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে বাংলাদেশে তাজিয়া মিছিলের সূচনা হয়।

 

নদীর তীরের ঐশ্বর্য

বুড়িগঙ্গার আছে আলাদা ইতিহাস, সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য। এই নদীর তীরে গড়ে ওঠা নান্দনিক ভবন কিংবা ঘটনাবহুল জায়গাও কম নয়। মোগল স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ইউরোপিয় কারুকাজের সংমিশ্রণে গড়া লালকুঠির কথা প্রথমেই বলা যায়। ভবনটির মূল নাম নর্থব্রুক হল। ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফর স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই ভবনটি টাউন হল হিসেবে নির্মাণ করা হয়। শ্রীহীন ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও হলের সেই জৌলুস আর নেই। ভবনের লাল রঙও মলিন হয়ে গেছে। ভেতরে-বাইরে পলেস্তারা-আস্তর খসে পড়েছে। হলের ভেতরে অবস্থিত লাইব্রেরির আলমারি ও প্রাচীন আমলের মহামূল্যবান বইপত্র প্রায় নষ্ট।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধুলি পড়েছিল এই লালকুঠিতে। সে ঘটনার প্রায় শতবর্ষ হয়ে গেল। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকায় আসা নিয়ে তত্কালীন ঢাকাইয়া সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শহরের গণমান্যদের মাঝে শুরু হয় এক প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা। উঠবেন কোথায় তিনি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী নবাবদের তুরাগ বোট হাউস? প্রকৃতির প্রেমে ডুবে থাকা গুরুদেব তুরাগ বোট হাউস বেছে নেন। আজ সে বোট হাউস নেই, তবে স্মৃতি হিসেবে যেন রয়ে গেছে কিছু ভাসমান হোটেল।

 

হোটেলগুলোর সামনেই তো দাঁড়িয়ে আছে আহসান মঞ্জিল। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে আহসান মঞ্জিলের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। ঢাকাই নবাবদের এই প্রাসাদ নিয়ে রয়েছে মানুষের ব্যাপক কৌতুহল। এটি এমন একটি ইমারত, যার সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ঢাকার নবাবদের নানাবিধ জনকল্যাণমূলক কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই প্রাসাদ ভবন।

ভবনটি যেখানে অবস্থিত সেই স্থানটিকে ইসলামপুরের কুমারটুলী মহল্লা বলা হয়ে থাকে। প্রাক মোগল সুলতানি আমলে সাধারণত বাসিন্দাদের পেশা অনুযায়ী এলাকার নামকরণ হতো। তখন কুম্ভকারদের বসতির কারণে এই স্থানের এমন নামকরণ হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। এর আশেপাশে এমন নামকরণকৃত তাঁতীবাজার, শাখারী বাজার, সীচীপান্দর প্রভৃতি মহল্লা আজও সেই বাসিন্দাদের পেশার পরিচিতি বহন করছে।

 

অলিগলিতে আড্ডা-উত্সব

তাঁতীবাজার, শাখারী বাজার কিংবা আশেপাশের জায়গাগুলোর নাম মুখে এলেই উত্সবের কথা মনে পড়ে। ইতিহাসের অনেক বাঁক অতিক্রম করে যারা নির্মাণ করেছে নগর, বসতি গড়েছে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকায় তারাও তাদের ঐতিহ্য-উত্সবের প্রকাশ ঘটিয়েছে এ ক্রমবর্ধমান নগর জনপদে। ধর্মীয় উত্সব ছাড়াও এ জনপদের নিজস্ব সংস্কৃতির উত্সব হচ্ছে—সাকরাইন বা ঘুড়ি উত্সব, পৌষসংক্রান্তি, হালখাতা ইত্যাদি। সাম্প্রতিককালে ঢাকায় হোলি উত্সবও উদযাপন করতে দেখা যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে জমজমাট হয় সাকরাইন। পুরোনো আমল থেকে পৌষকে বিদায় জানাতে মাঘ মাসের প্রথমদিন পুরান ঢাকার লোকেরা ঘুড়ি ওড়ায়। গ্লোরিয়া থেকে নবাবগঞ্জ ও ফুলবাড়িয়া থেকে সদরঘাট একই দৃশ্য। এটা যেন প্রাণের উত্সব!

শাখারীবাজার থেকে একটুখানি গেলেই শ্রীশদাস লেন। গলির বিউটি বোর্ডিংয়ে বসে পুরান ঢাকার সবচেয়ে জমজমাট আড্ডার আসর। এটি যেন কালের গ্লানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশভাগের পর বাংলাবাজার হয়ে ওঠে প্রকাশনা ও মুদ্রণ শিল্পের স্বর্গরাজ্য। তখন থেকেই বিউটি বোর্ডিংয়ে ভিড় জমাতেন শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এটি যেন হয়ে ওঠে সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। তখন তো প্রতিদিনই জমতো এখানে প্রাণের আড্ডা। আর খাবার? এখানকার সর্ষে ইলিশ থেকে শুরু করে কয়েক রকমের ভর্তা—সবই সবাই চেটেপুটে খায়।

 

ঢাকাই খাবার

ঐতিহাসিক বিবর্তনের সাক্ষী ঢাকার ৪শ’ বছরের সংস্কৃতির ইতিহাস বলে আদিকাল থেকেই অত্যন্ত ভোজনরসিক ছিল ঢাকাইয়ারা। আজ নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ নেই। তবু সেই আগের মতোই তাঁদের খাবারের হাঁকডাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক কানিজ-ই-বতুল গবেষণা করেছেন ঢাকার বিলুপ্ত খাবার নিয়ে। তিনি বলেন, ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মুন্সি মীর আমান দেহেলভির (দিল্লিবাসী) ১৮০১ সালে প্রকাশিত বাগ ও বাহার বইয়ে শাহী নিমন্ত্রণের খাবারের তালিকায় তোররাবন্দি, শবডেগ, মোরগপোলাও, মোরগ মোসাল্লাম, সিশরাঙ্গা (খাগিনা), হালিম, নার্গিসি কোফতা, কাবাব, হারিরা, মাকুতি, মুতানজান, শিরমাল, গাওজাবান রুটি, গাওদিদা রুটি, বাকরখানি রুটি—এমন সব খাবারের নাম পাওয়া যায়। এসব খাবারে কিছু টিকে আছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

তবে মোগল ঢাকার খাদ্য সংস্কৃতি ছিল সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। অত্যন্ত ভোজনরসিক মোগলরা খাবার নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করতেন। মোগল খাবারের জন্ম সম্রাট আকবরের রসুইঘরে বলে প্রচলিত আছে। তার শাহী রন্ধনশালায় নানা দেশের নানা জাতের বাবুর্চি ছিল। এসব খাবার যখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয় তখন লোভনীয় স্বাদের কারণে লুফে নেয় সাধারণ মানুষ। এরমধ্যে কোর্মা, পোলাও, বিরিয়ানি, কোফতা, ফিরনি, জর্দা, শাহী মোরগ পোলাও অন্যতম। মোগল যুগের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে বাকরখানি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের কাবাব ও শরবতেরও কদর রয়েছে এখন।

ঢাকা এখন দিনদিন পাল্টাচ্ছে। অলিগলির সংখ্যা, ভবনের ধরন, খাবারের স্বাদ, মানুষের মুখের বুলি কিংবা পেশা—সবই পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। যে ঢাকাকে বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির শহর বলা হতো, এখন কী তা আছে? প্রশ্নের জবাব মিলবে না জানি! সংখ্যা যাই হোক, আমরা চাই টিকে থাকুক পুরান ঢাকার সেই জৌলুস।