বুড়িগঙ্গা বাংলাদেশের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি নদী। ভারত-পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের সীমানা ভাগ হওয়ার আগেই গঙ্গা নদীর একটি শাখা পূর্ব বাংলার শ্যামল প্রকৃতির বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে ঠিকানা করে নিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বুড়িগঙ্গাই প্রাচীন পদ্মার-গঙ্গার খাত। রাজধানীর জননী নদী এটি। ৪০০ বছর আগে এই নদীকে আঁকড়ে ধরেই গড়ে উঠেছিল ঢাকা শহর। বুড়িগঙ্গা নামটির পেছনে পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে। গঙ্গা এই বুড়িগঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই। গঙ্গোত্রী হিমবাহের সঙ্গে লেনদেন চুকে গেলেও নামের সঙ্গে গঙ্গা শব্দটি শ’খানেক বছর ধরে জুড়ে রেখেছে এ নদীটি। জোয়ার ভাটা প্রভাবিত এই নদীটির উদ্ভব সাভারের দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদী থেকে। বলা হয়, গঙ্গা নদীর একটি প্রাচীন ধারা প্রাচীনকালে ধলেশ্বরী হয়ে সোজা বঙ্গোপসাগরে মিশেছিল। পরে সেই ধারাটি গতিপথ পরিবর্তন করে এবং গঙ্গার সঙ্গে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রাচীন গঙ্গা এই পথেই প্রবাহিত হতো বলে এ নদীটির নামকরণ। প্রকৃতপক্ষে এর প্রধান প্রবাহটি তুরাগ নদী থেকেই আসে। বুড়িগঙ্গা মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরীর সঙ্গেও মিলিত হয়। ছাগলকান্দির কাছে বুড়িগঙ্গার উজান অঞ্চল পলি ভরাটের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে গেছে এবং এটি কেবল বন্যার সময় প্রবাহ লাভ করে। বুড়িগঙ্গার ভাটি অঞ্চল সারাবছরই নাব্য থাকে। ধলেশ্বরী নদীর গতি-প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে ভাটি অঞ্চলে বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরী মিলনস্থলের পরিবর্তন ঘটে। ঢাকা শহরের ভূ-পৃষ্ঠে অথবা ভূ-গর্ভের অতি স্বল্প গভীরতায় ক্ষয়রোধকারী মধুপুর কদমশীলা পাওয়া যায়, ফলে বুড়িগঙ্গা নদীর গতিপ্রবাহ ঢাকা শহরে খুবই স্থিত। নদীটি অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীটি দিয়ে লঞ্চ ও দেশি নৌকা চলাচল করতে পারে। ১৯৮৯ সালে এই নদীর ওপর দিয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নামে একটি সেতু নির্মিত হয়েছে। বহু পরিবর্তনের পথ পাড়ি দিয়েছে নদীটি। রাজধানী ঢাকার জন্মদাত্রী নদীর রূপ, লাবণ্য আর স্নিগ্ধতার কিঞ্চিত বর্ণনা পাওয়া যায় কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের লেখনিতে—
‘সমালয় সন্নিহিত
বুড়িগঙ্গা প্রবাহিত
বান্দাঘাট শোভিত যাহাতে
সেখানে বসিয়া গিয়া
জুড়ায় সন্তাপ হিয়া
সলিল শিকড়সিক্ত রাতে।’
মোগল সুবেদাররা অনেকেই এ নদীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। বুড়িগঙ্গার তীরেই গড়ে উঠতে থাকে জমজমাট ঢাকা নগরী। নদী তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদকে আরেকটু রাঙিয়ে দিতে নদীর সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করেছিলেন বাংলার সুবেদার মুকাররাম খাঁ। তাঁর শাসনামলে শহরের যে সকল অতুশ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল সেখানে প্রতিরাতে আলোকসজ্জা করা হতো। এছাড়া নদী বুকে অসংখ্য জ্বলতো ফানুস বাতি। বুড়িগঙ্গা তীরে তৈরি হতো এক অপরূপ সৌন্দর্য। বর্ষাকালে এ নদী তীরের জনপদকে জলমগ্ন ভেনিস নগরীর সাথে গুলিয়ে ফেলতেন ইউরোপের বণিকরা। ১৮০০ সালে টেইলর বুড়িগঙ্গা দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, ‘বর্ষাকালে যখন বুড়িগঙ্গা পানিতে ভরপুর থাকে তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো।’ এমনকি গত শতাব্দিতেও বুড়িগঙ্গার সচ্ছ পানি বিনামূল্যে ভেনিস দেখার ব্যবস্থা করে দিতো। নদী তীরের স্থানের নামের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই নদীর ইতিহাস। নদীর অদূরে এখন যেখানে ‘নারিন্দা’, আদিকালে এর নাম ছিল ‘নারায়নদিয়া’। বর্ষাকালে এই এলাকা জলমগ্ন দ্বীপের মতো দেখাতো বলে লোকে হয়তো ‘নারায়নের দ্বীপ’ বা ‘ঈশ্বর প্রদত্ত দ্বীপ’ বলেও নামকরণ করেন। তবে বুড়িগঙ্গার আগের ঐতিহ্য এখন মলিন।
নদীর স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সময়ও ধেয়ে চলছে আপন বেগে। সেই সময়ের ক্ষুধার্ত গর্ভে নদী তীরে গড়ে ওঠা বহু অট্টালিকা হারিয়ে গেছে। মিল ব্যারাকের পুলিশ ট্রেনিং স্কুল চলে গেছে রাজারবাগ। বিভিন্ন লেখায় পাওয়া যায়, ৫০ বছর আগেও নদীর আক্রোশ মেটানোর জন্য লোকে লবণ, চিনি দান করেছে নদীর পানিতে। খোয়াজ-খিজিরের দোহাই দিয়ে মানত করে ভেলা ভাসিয়েছে। ইতিহাসে এমনও আছে, প্রবল স্রোতে নদী গর্ভে তলিয়ে গেছে সুবেদারের নৌ-বহর, রচিত হয়েছে তাঁদের সমাধি। মোগল আমল থেকেই নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরের উন্নয়ন শুরু হয়। কিন্তু সেই আমলের খরস্রোতা বুড়িগঙ্গার তীরে স্থায়ী বসতি স্থাপন করা ছিল বেশ মুশকিল। তাই তত্কালীন ঢাকার কমিশনার বুড়িগঙ্গার তীরে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ১৮৬৪ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন নদীর তীরে যে বাড়িঘরগুলো আছে সেগুলোর সামনের দিকে অনেকখানি বাঁধাই করে দেওয়া হবে। এতে নদীর পাড় দেখতে অনেকটা স্ট্যান্ডের মতো দেখাবে। দেখতে কেমন হবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাঁধ কাজ করবে কি-না! বাঁধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা গেল নদীর পাড় পুরোপুরি বাঁধিয়ে দিলে শহরের লেভেল নদী থেকে বেশ উঁচুতে থাকবে। প্রথমবারে এক পা, দুই পা করে নর্থব্রুক হল ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে যায়। জানা যায় যে, সরকারিভাবে বাঁধ নির্মাণের সম্পূর্ণ খরচ সামলে উঠতে না পারায় ঢাকার ধনী ব্যক্তিরা বাঁধ নির্মাণে সহায়তা করেন। যে নামগুলো এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের মাঝে রুপলাল, রঘুনাথ ও নবাব আব্দুল গণি উল্লেখযোগ্য। এভাবেই তৈরি হতে থাকে বাকল্যান্ড বাঁধ। সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরবর্তীতে বাঁধের পরিধি পরিবর্তন করা হয়েছিল বটে, তব সময়ের আবর্তে গতিপথ বদলেছে বুড়িগঙ্গা। বাকল্যান্ড বাঁধের কৃত্তিম ফ্রেমে সীমাবদ্ধ করা যায়নি বুড়িগঙ্গার পথচলা।
১৮৬৪ সালে যে বুড়িগঙ্গা বয়ে যেত লালবাগ কেল্লা, রায়ের বাজার আর পিলখানার ঘাটের ধার ঘেঁষে সময়ের সঙ্গে সে নদী সরে যেতে থাকে দক্ষিণে। উত্তরে জমতে থাকে পলি, শহরের আরেকটি অংশ জন্ম দিতে থাকে। ক্রমে ক্রমে পেরিয়ে গেছে মোগল, ব্রিটিশ আর পাকিস্তানি আমল। যে নদীর তীরে ঢাকার জন্ম তার বয়স ছাড়িয়ে গেছে ৪০০ বছর। নদী মাতাকূল ঘেঁষে বাকল্যান্ড বাঁধের তীরে গড়ে ওঠা শহরের উন্নয়নের জঞ্জাল তিলে তিলে ধ্বংস করে দিয়েছে নদী মাতার আসল রূপ। আগে চলছে শহর, পেছনে তার মাতৃনদী। বিসর্জনের যেন কোনো ইয়াত্তা নেই। জলযান ও গৃহস্থালি থেকে প্রতিদিন কঠিন বর্জ্য, নদীর পাশে গড়ে ওঠা ছোটবড় পোশাক শিল্পের রাসায়নিক বর্জ্য, রঙ ঠায় পায় এই বুড়িগঙ্গার গর্ভে। চামড়া শিল্পে বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরেই। কিন্তু এই চামড়া শিল্পের মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে অশোধিত বর্জ্য এসে পড়ছে বুড়িগঙ্গায়। ট্যানারি থেকে বাদ যাওয়া চামড়ার অংশ থেকে শুরু করে বিষাক্ত সব ভারী ধাতুর শেষ ঠিকানা এই বুড়িগঙ্গা। অনেক কম মূল্যে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান ধরতে গিয়ে আমরা বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে তুলেছি এই ট্যানারি। সুইজারল্যান্ডের গ্রিন ক্রস আর ব্ল্যাকস্মিথ ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্য অনুসারে হাজারীবাগ এবং আশেপাশের এলাকায় পৃথিবীর দূষিত স্থানগুলোর মাঝে পঞ্চম।
এই নদীকে কেন্দ্র করে ঢাকা হয়ে ওঠে অন্যতম বৃহত্ বাণিজ্যিক নগরী। পণ্য আদান-প্রদান থেকে শুরু করে যাত্রী পরিবহন, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে সবই বাড়তে থাকে। এসব দূষণের কারণে নদীতে জলজ প্রাণী বসবাস অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুড়িগঙ্গার পাশ দিয়ে চলাচল মুশকিল হয়ে গেছে। সেখানে এই পানিতে মাছ তো দূরের কথা স্বাভাবিক জলজ প্রাণী বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এই পানি পরীক্ষা করে দেখা যায়, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বেড়ে গেছে বিষাক্ত পদার্থ ও ধাতুর পরিমাণ। শুধু তাই নয়, পানি বিশুদ্ধতার সব ক’টি সূচকেই বুড়িগঙ্গায় প্রাণী বসবাসের অযোগ্য। তবে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর পানির দূষণ মাত্রা তুলনামূলক হ্রাস পায়। কালের বিবর্তনে বুড়িগঙ্গার প্রাচীন ঐতিহ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত। তবে জননী নদীর নির্মম পরিণতির সঙ্গে নগরবাসীর ভাগ্য জুড়ে নেই—এমনটা ভাবা নিছক বোকামি।
ছবি :তন্ময় মির্জা
