জীবনে চাওয়া-পাওয়ার মাঝে বিতর্কহীনভাবেই একটা গ্যাপ থাকে। থাকতেই হয় মনে হয়। আর সেজন্যই চাহিদার আকাঙ্ক্ষা যেমন থাকে, তেমনি না পাওয়ার কষ্টও হয় তীব্র!
যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হবো। মুখ ফুটে আজকের আগ পর্যন্ত কাউকে সে কথা বলা হয়নি। হাইস্কুলে পড়ার সময়ে এমনকি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় স্বপ্ন দেখতাম ক্রিকেটার হবো। সেসময়টায় টুকটাক বিচ্ছিন্নভাবে খেলতাম। কথ্য ভাষায় যেগুলোকে ‘খ্যাপ’ খেলা বলে। ২শ’ থেকে শুরু করে কখনো কখনো ১ হাজার টাকাও পেতাম। আমার সঙ্গে খেলতো বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী কাজল। আফ্রিদি টাইপের ব্যাটসম্যান ছিল কাজল। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হওয়ার কারণে পড়াশোনার ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হয়েছে। এক সময় দায়িত্বের পাহাড় ঘাড়ে সেই চাপও অনুভব করতাম বলে মানসিক প্রস্তুতি ছিল।
ফুটবলার থেকে শুরু করে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে সময়ের স্রোতে। সম্মান শ্রেণি পর্যন্ত কুমিল্লাতেই থাকলাম ঢাকায় জন্ম নেওয়া আমি। তারপর আবার ঢাকায় ফেরা। উদ্দেশ্য মাস্টার্স করবো। আইবিএ-তে অপেক্ষমান তালিকায় স্থান হলো, হলো না আসল তালিকায়। মনের দুঃখে ভর্তি হলাম তিতুমীর কলেজে। মাস্টার্স রেজাল্ট হওয়ার আগেই চাকরি নিতে বাধ্য হলাম। তখন আমার সব বন্ধুরা ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত। কিন্তু আমার উপায় ছিল না। আব্বার ছোটখাটো একটা ব্যবসা ছিল, সেটা বন্ধ হয়ে গেল। বছর দুয়েকের ছোট ছোট ভাইয়ের এমবিএ চলছে তখন।
নতুন চাকরি। শুরুতে বেতন ১২ হাজার টাকা। টানাটানির সঙ্গে আহারে কী প্রেম ছিল আমার। আব্বা বুঝতো, তবে আমার ওপর আস্থাও ছিল তাঁর অনেক। বছর ঘুরে বেতনও বাড়ে, কিন্তু খরচের তুলনায় সেটা খুবই নগণ্য। বিক্রি ও বিপণনের চাকরি ছিল বলে কমিশন পেতাম। হাসিমুখ দিয়ে কষ্টকে জয় করতে হতো মাসের ২০ তারিখের পর থেকেই।
আরো দু-এক জায়গায় চাকরি করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম বিদেশে যাবো। প্রথম পছন্দ অস্ট্রেলিয়া হলেও সেখানে পরিচিত কেউ থাকতো না বলে কানাডাতে আসবো এটাই ফাইনাল। বিপত্তি হলো আমিতো বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলতে পারি না। তার ওপর আইইএলটিএস-এর মতো অগ্নি পরীক্ষা কেমনে পার হবো। শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। কোচিংয়ে গেলাম। শিক্ষকের সাথে ঝগড়া করে চলে এলাম। প্রিয় পল্লব ভাই তাঁর বাসায় নিয়ে পড়িয়েছিলেন। সবসময় সব বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ পেতাম কানাডাতে বসবাসকারী কাজিন শ্যামল ভাই থেকে। আহা কী চেষ্টা., কিন্তু হাল ছাড়িনি।
অবশেষে অনেকের মতে সোনার হরিণ সেই কাঙ্ক্ষিত ‘কানাডা ইমিগ্রান্ট ভিসা’ পেয়েও গেলাম। চোখ-মুখে চাপা আনন্দ। গ্রামের মেঠোপথে ছুটে বেড়ানো সুমন যাবে কানাডা। আব্বা-আম্মার টেনশন কিছুটা কমলো। আরো একটু স্বাচ্ছন্দ্যে বাকি জীবনটা কাটবে তাঁদের। অন্যান্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। ২০১৩ সালের মার্চ মাসের ৩১ তারিখ আমার ফ্লাইট। আব্বা-আম্মা, দাদী, ছোট ভাই রুমন, দুই কাজিনসহ অনেক বন্ধু এয়ারপোর্টে এলো। আহা কী আনন্দ! ভেতরের খবর কাউকে বুঝতে দিলাম না। ইমিগ্রেশনে ঢোকার আগে আব্বা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁদলেন। আমি চোখ আড়াল করে রাখলাম। আম্মাও কাঁদছিলেন। একে একে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইমিগ্রেশনে ঢুকে গেলাম। দেয়াল হয়ে থাকা কাঁচের ভেতর থেকে দেখলাম পরিবারের পুরোটা তাকিয়ে আমার দিকে। মনে হলো সিনেমায় নির্মাতারা যা দেখান সে সবকিছুই মিথ্যে নয়। আব্বা বসেছিলেন। কিছুতেই যেন নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না।
জীবনে প্রথমবারের মতো প্লেনে চড়ে বসলাম। ইস্তাম্বুল পর্যন্ত প্রায় ৯ ঘণ্টার জার্নি শেষে কয়েক ঘণ্টা বিরতির পর আবারো প্রায় ৯ ঘন্টা জার্নি করে পৌঁছালাম কানাডার টরন্টোতে। চকচকে জকমকে শহরটা দেখে খুবই ভালো লাগলো। শ্যামল ভাই এলো আমাকে রিসিভ করতে। গাড়িতে উঠেই বললাম দেশে ফোন করবো। কিন্তু একথা ওকথা বলে গাড়িতে থাকা অবস্থাতে ফোন করতে দিলো না। বাসায় নিয়ে গেল। বললাম, দেশে ফোন করবো তখন ভাইয়া এবং বিন্দু আপা (ভাবি) বললো আগে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও তারপর কথা বলো। তখনো বুঝতে পারিনি আমার জন্য কী খবর অপেক্ষা করছে। আরেক কাজিন কনা ও তার জামাইও ছিল তখন।
তারপর সেই ভয়াবহ দুঃসংবাদ। আমি প্লেনে থাকা অবস্থাতেই আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং ৫ মিনিটের মাঝেই চলে যান না ফেরার দেশে!
কি যে কষ্ট কিযে ব্যথা কি যে যন্ত্রণা। কিভাবে কেটেছিল সেই সময়টা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বর্তমান সময়টা চলছে নানামুখি ব্যস্ততায়। লেখালেখির পাশাপাশি জীবিকানির্বাহের জন্য ব্যস্ত থাকতে হয় বেশিরভাগ সময়। খেলাধুলাটা রক্তের সঙ্গে মিশে আছে ছোটবেলা থেকেই। বিশেষ করে ক্রিকেট। ১৪ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডার টরন্টো শহরে এসেও খুঁজে নিয়েছি ক্রিকেট। স্বাধীন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলা শুরু করলেও পরবর্তীতে কানাডার মূলধারার ক্রিকেটের ক্লাব ড্যানফোর্থ ডায়নামাইটসে দু-বছর পার করে এখন খেলছি ‘টিম সেভেন্টিওয়ান ক্রিকেট ক্লাব’-এ।
নিজের স্বপ্ন আর ইচ্ছের দৃঢ়তা থাকলে যে যেকোনো সময়েই সেই স্বপ্ন পূরণে আত্মপ্রত্যয়ী হয় মানুষ। আমিই তাঁর অন্যতম উদাহরণ। কারণ নিজের জীবিকার পাশাপাশি নানাভাবে ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার। একটু একটু করে কানাডার মূলধারার ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা হলো। সেই পথচলার ধারাবাহিকতায় নামীদামি ক্লাবের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রিমিয়ার ডিভিশন (টরন্টো, কানাডা) খেলার জন্য। একজন বাংলাদেশি হিসেবে যখন মূলধারার ক্রিকেটে খেলি তখন প্রতিক্ষণেই মনে হয় আমি নই, আমার দেশকে উজ্জ্বল করার জন্য খেলছি। কারণ আমার সঙ্গে আরো ক’জন বাঙালি কলিগ ছাড়াও একাধিক দেশের ইমিগ্রান্ট নাগরিকও রয়েছেন। তাই সকলেই যেন আমরা নিজ নিজ মাতৃভূমির পতাকাটা বুকের ভেতরে অদৃশ্যভাবে বেঁধে রাখি। যখন কোনো ম্যাচে আমি ম্যান অব দ্য ম্যাচ হই তখন যেন আমি না, আমার বাংলাদেশকে ম্যাচ সেরা বানিয়ে ফেলি।
টরন্টো, কানাডা
