আমার বাবা মফিজুল হক, মা ফতেমা খাতুন। আমরা ৫ ভাই ২ বোন। আমি যখন আমার মায়ের কথা ভাবি তখন দুটি বিষয় আমার বিশেষ ভাবে মনে পড়ে। মা নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসে আমাকে ‘কর্ণ-কুন্তী-সংবাদ’ কবিতা মুখস্থ করাচ্ছেন। এতে এতো আবেগ ছিলো যে আজও আমার মুখস্থ: ‘পূণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যাসবিতার/বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার/অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত/সেই আমি--আসিয়াছি, কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!....’ ইত্যাদি।
যখন বড় হয়েছি ভেবেছিলাম কর্ণ-কুন্তী নিয়ে একটা দার্শনিক বিচারমূলক লেখা লিখব; জননীকে মনে রেখে। কিন্তু লিখতে বসলেই মায়ের জন্য আমার চোখে পানি চলে আসে। মনে হয় আমার মা জলজ্যান্ত আমার সামনে এসে বসে আছেন। আমি আর লিখতে পারি না। আর একটা স্মৃতি। আমি নোয়াখালীতে জন্ম গ্রহণ করি। নোয়াখালী অত্যন্ত ধর্মভীরু, ধর্মপ্রাণ মানুষদের জেলা। আমাদের পরিবার বিশেষত আমার মা ও মামাদের তরফ থেকে এক ধরনের আধ্যাত্মিক বিষয় ছিল। আমার দাদা সিরাজুল হককে আমি দেখিনি, তবে তার দরবেশসুলভ জীবনযাপন মায়ের কাছে শুনেছি। মার সঙ্গে যখন বড় হচ্ছিলাম তখন মা আমাকে বলেছিলেন—কোরআন শরিফ পানিতে ডোবে না, কোরআন শরিফ আগুনে পোড়ে না। আমাকে আরবি পড়তে পাঠানো হতো। আমার ওস্তাদজিও বললেন, হ্যাঁ কোরআন শরিফ পানিতে ডোবে না, পোড়ে না। আমিও সেটা গভীরভাবে বিশ্বাস করেছি। একদিন ভরা বর্ষা। অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। পুকুরগুলো পানিতে ভরে গিয়েছিল। তখন আমি বিষয়টি পরীক্ষা জন্য কোরআন এনে পানিতে ফেলে দিলাম এবং দেখলাম কোরআন পানিতে ডুবে গেল। এতে আমি প্রচন্ডভাবে ভীত এবং ট্রমাটাইজড হয়ে পড়লাম। কোরআন পানিতে ডুবেছে তার জন্য না, আমি ভয়ংকর বিস্মিত ও আহত হয়েছিলাম যে মা মিথ্যে বলেছেন। মায়ের সাথে ছেলের ট্রমাটিক একটা সেপারেশন হয়েছে। শুনেছি আমি অসুস্থ হয়ে এমন পর্যায়ে গিয়েছিলাম যে ডাক্তার আমাকে ভালো করতে পারছেন না। তখন আমার ওস্তাদ ছনখোলার দরবেশ হুজুরের কাছে নিয়ে গেলেন ঝাড়-ফুঁকের জন্য। ওনার কাছে রেখে ওস্তাদজি চলে আসেন। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন একটি জায়গা। সেখানে ঘুরে ঘুরে হাঁস-মুরগি, গরু-বাছুর দেখছি। সন্ধ্যার দিকে পশ্চিমে লাল সূর্য হেলে পড়ছে। এমন সময় লুঙ্গি পরা খালি গায়ে ছনখোলার হুজুর এলেন। আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘সন্ধ্যা হয়ে গেল বাড়ি যাবে না?’ বললাম, ‘না যাব না।’ ‘কেন?’ ‘মা মিথ্যে বলেন।’ কী বলেছে তা-ও বললাম। তারপর তিনি আবারও আমার হাত ধরে হাঁটতে লাগলেন। বেশ কয়েবার বাড়ি যাওয়ার বিষয় জানতে চাইলে আমি একই উত্তর দেই।
সূর্য যখন ডুবছে। আকাশ লাল। সেই সময় তিনি আমাকে দুই হাত দিয়ে কোলে তুলে মধুর সুরেলা কণ্ঠে কোরআন তেলওয়াত করতে লাগলেন। সেই তেলওযাতের সুর আমি আজও শুনতে পাই। তেলওয়াত্ শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। হুজুর আমাকে ডেকে তুলে যা বললেন তা আমি কোনদিন ভুলতে পারিনি। বললেন, ‘কোরআন তো পানিতে ডুবে নাই, ডুবেছে কাগজ।’ এর পর পরই আমি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে গেলাম। পরিবার থেকেই আমি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা যেমন পেয়েছি, তেমনি আধুনিক শিক্ষাও। পরে আমি নিজে মার্ক্স-লেনিনও পড়েছি। কিন্তু পারিবারিক স্পিরিচুয়ালিটি আমার মধ্যে রয়ে গিয়েছে। সেখান থেকে বের হতে পারিনি।
নোয়াখালির মাইজদি কোর্টের সুধারাম থানায় আমার বাড়ি। আমার বাবার কাছ থেকে আমি বিনয় আর সামাজিকতা শিখেছি। ভুল কিছু হলে ফুপির বকা বেশি খেয়েছি। আমাদের পড়াতো চাচা মামারা, তারা ছিলেন আমাদের অভিভাবক। বর্ষার সময় মাইজদি ডুবে যেত, তখন তালের ডিঙ্গি বানিয়ে ৭ কিলোমিটার দূরে মামার বাড়ি চলে যেতাম। এবার আসি ভাই-বোনদের কথায়। বড় বোন নীরু মাহবুবা হক এবং বড় ভাই ফারুক মোজাম্মেল হকের প্রভাব আমার জীবনে অসীম। আমার পড়াশোনা লেখা-লেখিতে তাদের সহযোগিতা পেয়েছি। বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়তেন। বাড়িতে যাওয়ার সময় আমার জন্য তার পাঠ্য ইতিহাসের বই নিয়ে যেতেন। আমাকে পড়ে শোনাতেন। বড় ভাই আমাকে কবিতা লিখতে উৎসাহিত করতেন। বড় ভাই একবার ঢাকা থেকে আমার জন্য জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা ও বিষু দের কবিতার বই নিয়ে আসেন। পরিবারেই আমার রাজনীতি, ধর্ম ও সাহিত্যের একটা মিশ্রণ ঘটে। আমি পরীক্ষায় ভালো ফল করতাম। পরিবার কখেনো বই পড়তে নিষেধ করেনি। প্রথম প্রেমের কবিতা স্থানীয় পত্রিকায় ছাপা হয়। পাড়ায় একটা লাইব্রেরি ছিলো। দুরন্ত শৈশবে আমরা পাড়ায় সবাই খেলতে খেলতে দুপুরে এক একদিন এক এক বাড়িতে খেতাম। কারো বাড়িতে কম পড়লে অন্য বাড়ি থেকে নিয়ে আসতো। পারিবারিক বন্ধনের মতো সামাজিক বন্ধনও আন্তরিক ছিল। মায়েরা চিন্তাও করতেন না।
আমরা খুব ধনী পরিবার ছিলাম না। পরিবারের কাছ থেকেই মূল শিক্ষা পাই। আমার মধ্যে ভালো কোন কিছু থাকলে বা আদৌ যদি কোন প্রতিভা থাকে আমি আমার মা, বড় ভাই ও বড় বোনের কাছ থেকে পেয়েছি। কৃষি পরিবার ছিলাম বলে আমরা চাষাবাদ করতাম।
মাকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করি বলে শিশুকে মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন করার আমি ঘোর বিরোধী, শিশুদের ৫ থেকে ৭ বছর বয়সে স্কুলে কিংবা মায়ের কাজের জন্য আলাদা করা একটি অপরাধও বটে। ইসলাম একে জুলুম বলে। কারণ এ সময় শিশুর স্নায়ুর বিকাশ ঘটে। আমার মা বড় শিক্ষক। নারীদের কাজের জায়গাতে সন্তান রাখার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
আমি বিদেশে পড়াশুনা করেছি। ছেলে-মেয়ে নিয়ে প্রথম স্ত্রীর সাথে বিদেশে ছিলাম। কিন্তু একটা সময় আমার মনে হল, আমি যুদ্ধ করেছি যাদের সাথে, তাদের সাথে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। তাই পরিবার রেখে দেশে চলে আসি। এটা আমি ঠিক করেছি মনে করি না। কিন্তু দেশে না ফিরলে নিজে অপরাধী বোধ করতাম এবং নিঃশেষ হয়ে যেতাম। আমি যখন চলে আসি তখন সাকী সেলিমাই সন্তাদের লালন পালন করেছেন। তিনি একজন অসাধারণ মহিলা। সন্তানদের জন্য আমার বাবা-মা র মতো আমি হতে পারিনি। এটা আমাকে খুবই অপরাধী ও লজ্জিত করে রাখে। আমার মেয়ে ল ইয়ার, সে তার আয়ের বড় একটা অংশ সন্তানদের বাংলাদেশে আনার জন্য ব্যয় করতেন। যেন বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বন্ধন গড়ে ওঠে। আমার নাতী আমার সাথে গ্রামে সময় কাটায়। কৃষিকাজ শেখে। এখনো একটা ভালো বই পড়লে আমার মেয়ে আমাকে জানায়, আমিও তাকে জানাই।
আমার জীবনে ফরিদা আখতারের অবদান অসামান্য। আমরা যা কিছু করেছি এক সাথেই করেছি। অর্জনও আমাদের এক সাথেই। আমি আমার তরুণ বয়সের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে ভুল করিনি। তার সাথে সাথে আমার সম্পর্ক পারিবারিক ভাবেই ঘটেছে। তিনি আমার মায়ের অত্যন্ত স্নেহের পাত্রী ছিলেন।
আমি মনে করি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বচ্ছতা থাকা খুবই জরুরি। ভুল হলে ক্ষমা করতে হবে। তবে গভীর ও নিঃশর্ত ভালবাসা ছাড়া আর কোন সহজ নিয়ম নাই। আমার অভিজ্ঞতা বলে পারিবারিক বিষয়ে ছেলেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। আমি সিদ্ধান্ত নেই না। আমার বাবা পুরো বেতন আমার মায়ের হাতে তুলে দিতেন। পরে দরকার মতো চেয়ে নিতেন। উনি ইচ্ছে করলে সিগারেট খাওয়ার টাকা রেখে দিতে পারতেন। কিন্তু রাখতেন না। আমিও তাই করি। আমি মনে করি অর্থনৈতিক বিষয়টি স্ত্রীর হাতেই থাকা প্রয়োজন।
(আজ আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। এ উপলক্ষে ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য লেখাটি লিখেছেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, লেখক, চিন্তক ফরহাদ মজহার। অনুলিখন: রাবেয়া বেবী। লেখাটি ঈষত সংক্ষেপিত)

