এবার বোরো ধানের উৎপাদন বাড়ায় হাওর অঞ্চলের কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। অনুকূল আবহাওয়া সেখানকার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। প্রতিদিন খেত বা হাটে প্রতিযোগিতামূলক দামে ধান বেচাকেনা চলছে। এরই মধ্যে বাড়তি দরে সরকারি সংগ্রহ অভিযানের সুফলও পেতে শুরু করেছেন কৃষকরা। তবে মৌসুমের শুরুতে বোরোর এ বাজারে দর কারসাজি বা সিন্ডিকেটের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বোরো ধানের উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং সংলগ্ন কয়েকটি জেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের ধান বেচাকেনার প্রধান মোকাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জের মেঘনাতীরবর্তী ধানের গল্লা। কৃষক, ব্যাপারী, পাইকারদের ধান ব্যবসার কেন্দ্রস্থল এটি। এ মোকামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতশত চাতাল ও প্রায় অর্ধশত অটো রাইস মিল। আশানুরূপ সরবরাহ না থাকায় মৌসুমের শুরু থেকেই ধানের বাজার তেঁতে উঠেছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন চাতাল ও অটো মিল মালিকরা।
ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বেশ কয়েক জন কৃষক জানিয়েছেন, ‘নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে উৎপাদিত ধানের একটি ছোট অংশ মৌসুমের শুরুতে আমরা বিক্রি করি। বাকি সব ধান বেশি দরে বিক্রির জন্য শুকিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ করি।’
মোকামে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার কথোপকথনে প্রতিদিনের ধানের দর নির্ধারিত হয়। দরকষাকষির মাধ্যমে উভয় পক্ষই লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেন। ধানের বাজারে তথাকথিত সিন্ডিকেটের কোনো অস্তিত্ব নেই। এখন আশুগঞ্জের ধানের গল্লায় মোটা জাতের প্রতি মণ (প্রায় ৪০ কেজি) ধানের দর প্রায় ১ হাজার টাকা এবং সরু জাতের প্রতি মণ ধান বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকার খেত ঘুরে তারা কৃষকদের কাছ থেকে ৯৫০ টাকায় কেনা ধান গল্লায় বিক্রি করেছেন ১ হাজার টাকায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দেশে ২ কোটি ২৬ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদন হতে পারে, যেখানে আগের বছর উৎপাদন ছিল ২ কোটি ১০ লাখ টন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বোরো চাল জাতীয় চাহিদার ৫৮ শতাংশ পূরণ করে।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর হাওরের কৃষক মো. ইদ্রিস মিয়া (৫৩) জানান, নিজের আবাদে প্রতি একরে ৮০ মণ বোরো (বিআর-১১) ধান পেয়েছেন তিনি; যা আগের বছরের তুলনায় ৮ মণ থেকে ১০ মণ বেশি। তিনি জানান, উৎপাদন বাড়লেও মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম আশানুরূপ বাড়েনি। এবার প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ গড়ে ৮০০ টাকা হলেও কিছু ধান খেতে ৯৫০ টাকা এবং হাটে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছি। নিকট ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় বাকি ধান সংরক্ষণ করে রাখেন বলেও জানান তিনি। নেত্রকোনা জেলার মদনের রিটন মিয়া (৪৭) জানান, তিনি তিন একর জমিতে বোরো করেছেন। একর প্রতি পেয়েছেন প্রায় ৯০ মণ। তার উত্পাদন ব্যয় মনপ্রতি ৭৫০ টাকা। এক একরের ধান খেত থেকে ৯৫০ টাকা দরে বিক্রি করে বাকিটা সংরক্ষণ করে রেখেছেন। রিটন মিয়া বলেন, এখন অসচ্ছল কৃষকরা প্রয়োজনে কম দামে ধান বিক্রি করছে। পাইকার, ব্যাপারী ও মিল মালিকরা এসব ধান কিনে মজুত করছে। সামর্থ্যবান কৃষকরা বাড়তি বাজারে চড়া দামে বিক্রির আশায় ধান সংরক্ষণ করে রাখছেন। তার হিসাবে এবার আগের বছরের তুলনায় বোরোর উৎপাদন বেড়েছে ১০ শতাংশের বেশি। ফলে বিদায়ি বছরের মতো এবার ধানের দাম বাড়ার সম্ভাবনা কম।
মেঘনার চরে ধানভর্তি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দাঁড়িয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপচারিতায় ধানের ব্যাপারী গাজী মো. শরীফ খান জানান, মোবাইল ফোনের সুবাদে এখনকার কৃষকরা প্রতিদিনের ধানের বাজারদর জানেন। চাহিদা বাড়লেই কৃষকরা দাম বাড়িয়ে দেন। অনেক কৃষক সরাসরি মিল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করেন। ফলে ধানের দাম বাড়লে তার সরাসরি সুফল পায় কৃষক। সচ্ছল কৃষকরা রোদে শুকিয়ে ধান সংরক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে। গত বছর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বিপরীত অবস্থা ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হবিগঞ্জের মাধবপুর ঘুরে কৃষকের খেত থেকে ধান কিনেছেন হাজী দানা মিয়া অ্যান্ড সন্স চাতাল কলের মালিক চান মিয়া। এ কাজে দেড় যুগের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সার ও বীজের সহজলভ্যতা আর নতুন প্রযুক্তি সুবিধার কারণে কৃষক কম জমিতে কম খরচে বেশি ফলন পাচ্ছে। ভালো দাম পেতে অধিকাংশ কৃষক চাউল কলে সরাসরি ধান বিক্রি করছেন। ফলে ধানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ নেই। যে কারণে ধানের দাম কমাতে বা বাড়াতে কোনো যোগসাজশের সুযোগ নেই।
আশুগঞ্জের সোহাগপুরের অটো রাইস মিল মালিক শাহীন আলম জানান, এবারও মৌসুমে তার মিলের জন্য প্রতিদিন ৪ হাজার মণ ধান কিনছেন। কৃষক, ব্যাপারী ও পাইকারদের কাছ থেকে শুকনা মোটা ধান ১ হাজার ৫০ টাকা এবং চিকন ধান ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে কিনছেন। তার মতে, ধানের তুলনায় অনেক বেশি লাভের কারণে কৃষকরা ১২ মাসি বা মৌসুমি সবজি চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এতে করে ধান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ছে না। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলেই ধান-চালের দাম বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমাদের কৃষকরা তাদের নিজের শ্রমের মূল্য ধরে না। এটা মূল্যায়ন করেই ফসলের দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।’ কৃষকের শ্রম ও জমির মূল্য ধরে ধানের দাম নির্ধারণ না করলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ও শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেন, আগের তুলনায় উৎপাদন খরচ বাড়লেও অনুকূল আবহাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রেকর্ড পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকার আগের তুলনায় বাড়িয়ে ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫ লাখ টন ধান সংগ্রহ শুরু করায় প্রান্তিক কৃষকরা মোটামুটি দাম পাচ্ছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ দর আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, নিজস্ব বা স্থানীয় পর্যায়ে অধিকাংশ কৃষকের ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং ঋণগ্রস্ত কৃষকরা উৎপাদন মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফলে যখন ধানের চাহিদা বাড়ে তখন দরিদ্র কৃষকের হাতে ধান থাকে না এবং বাড়তি দামের সুফলও পায় না।

