তিন রুমের ছোট একটি বাসা। সেই বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন ব্যবসায়ী মুনিরুজ্জামান আল ফারুক এলাহী। এই তিনটি রুমেই আলমিরা, শোকেস আর দেওয়ালে তাক বসিয়ে ‘জাদুঘর’ সাজিয়েছেন মুনিরুজ্জামান। সেই জাদুঘরে রয়েছে বাদশাহী আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের প্রাচীন ও দুর্লভ অন্তত আড়াই হাজার বস্তু।
সিরাজগঞ্জের কলেজ রোড এলাকায় নিজ বাড়ির তিনটি রুমেই এই ব্যতিক্রমী জাদুঘরটি বানিয়েছেন মুদ্রণ ব্যবসায়ী মুনিরুজ্জামান আল ফারুক নূরে এলাহী।
সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা মেলে সত্তর দশকের সময়ের পুরোনো একটি থ্রি-ব্র্যান্ড সচল রেডিও। সুইচ টিপতেই রমী শিল্পী আব্দুল আলীমের গান বেজে ওঠে সেই রেডিওতে। গত ৫৪ বছর আগে, ওই রেডিওতেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান ও সংবাদ শোনা হতো বলে জানান মুনিরুজ্জামান।
একইভাবে নব্বই দশকের জনপ্রিয় ক্যাসেট প্লেয়ারও দেখা গেছে। সেটিও সচল রয়েছে। এমন বেশ কয়েকটি বিলুপ্ত প্রায় রেডিও এবং টেপ রেকর্ডার শোকেসের তাকগুলোতে রয়েছে। আশির দশকে বিলুপ্ত হওয়া গ্রামোফোন যাকে বাংলায় কলের গান বলা হতো সেটি সংগ্রহে রয়েছে তার। প্লেটের মতো সিডি ঢুকানো হলেই সচল এ গ্রামোফোনে গান বেজে ওঠে।
এছাড়াও উটের হাড়ের তসবিহ, রাজা-বাদশাহর আমলের কবিরাজি দাওয়াই সংরক্ষণ ও সেবন করার পাত্র, জমিদারি আমলের হুক্কা, কাসা, তামা ও পিতলের তৈরি কুপি বাতি, অর্ধশত বছরের পুরনো দেওয়াল ঘড়ি, টেলিফোন, বুদ্ধমূর্তি, গোপাল মূর্তি, স্বাধীনতা পরবর্তী সাংবাদিকদের ব্যবহৃত ক্যামেরা, ভয়েস রেকর্ডার, টাইপ মেশিন, বিভিন্ন দেশের প্রাচীন মুদ্রা, বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রের প্রাচীন ডাকটিকিট, অসংখ্য পুরোনো চিঠি, ম্যাচ বক্সসহ আরও অনেক কিছুই দেখা যায় তাকগুলোতে।
অর্ধ ইঞ্চি আয়তনের কোরআন শরীফ রয়েছে তার সংগ্রহে। একইসঙ্গে দেড় ইঞ্চি ও সোয়া ইঞ্চি আয়তনের একাধিক কোরআন শরীফও তার সংগ্রহশালায় রয়েছে।
জানা যায়, মুনিরুজ্জামান আল ফারুক নূরে এলাহীর বাবা ভাষা সৈনিক আবুল ফাত্তাহ নূরে এলাহী, ফুপু ভাষা সৈনিক মেহের নিগার নূরে এলাহী এবং চাচা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আবুল কাশেম নূরে এলাহী।
১৯৪০ সালে ‘নূরে এলাহী প্রেস’ নামে সিরাজগঞ্জ শহরে মুনিরুজ্জামানের দাদা আবুল মুনসুর নূরে এলাহী প্রথম মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। উত্তরবঙ্গে এটি ছিল প্রথম কোনো মুসলমানের মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে তিনি সেই শিল্পকেই পেশা হিসেবে ধরে রেখেছেন।
বিরল সব সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে মুনিরুজ্জামান আল ফারুক নূরে এলাহী বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ডাকটিকিট কিনতাম। এ টু জেড সব দেশের ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছি। প্রতিবছর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ হতো স্কুল জীবনে। তখন একটা করে প্রজেক্ট আবিষ্কার করে প্রতিবছরই প্রথম হতাম। সেই সুবাদে সরকারি খরচেই বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করানো হতো আমাকে। একবার জাতীয় জাদুঘরেও নিয়ে যাওয়া হয়; জাদুঘর দেখেই একটা নেশা ধরে যায় আমার। এমন জিনিসপত্র তো নিজেও সংগ্রহ করে রাখতে পারি। সংগ্রহের প্রতি আগ্রহ জন্মে সেখান থেকেই। দীর্ঘদিন ধরেই এ সংগ্রহ করে আসছি আমি।
তিনি আরও বলেন, যখন যেখানে যে জিনিস পাই সেটাই নিয়ে আসি সংগ্রহ করে। এর জন্য অনেক ঝড়ও বয়ে গেছে আমার ওপর। অনেকে আবার পাগলও বলে। গত ৪৪ বছর ধরে সংগ্রহ করে চলেছি। বর্তমানে সংগ্রহশালায় আড়াই হাজারেরও বেশি আইটেম রয়েছে আমার। যদি নিজের কোনো বাসা করতে পারি, সেখানে একটি কক্ষে গ্যালারি তৈরি করে উন্মুক্ত করে দেব সবার জন্য। তবে সরকার থেকে সহযোগিতা পেলে সেই আশাটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো।

স্কুলশিক্ষকের বাড়ির আঙ্গিনায় অন্যরকম জাদুঘর