কুড়িগ্রামে খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছে। রাজারহাট উপজেলায় গত ১৫ দিনে ২২টি গরুর মৃত্যু হইয়াছে। খামারিরা আতঙ্কিত হইতেছেন। তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দাবি, তাহার জানা মতে, খুরা রোগে ৩২টি গরু আক্রান্ত হইয়াছিল, তিনটির মৃত্যু হইয়াছে। মূলত সময়মতো টিকা না দেওয়ায় গরু ও বাছুর খুরা রোগে আক্রান্ত হইতেছে। আর মৃত গরুর মধ্যে বাছুরই বেশি। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলিতেছেন, নিয়মিত টিকা দিলে এই রোগ হইতে প্রায় শতভাগ নিরাপদ থাকা যায়। তবে উপজেলায় খুরার ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত থাকিলেও অন্যান্য রোগের ঔষুধের অপ্রতুলতা রহিয়াছে, সেইসঙ্গে আছে জনবল সংকট। এই উপজেলায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাসহ ১১টি পদে জনবল সংকট দীর্ঘদিন ধরিয়াই চলিতেছে। ফলে খামারিরা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর হইতে চাহিদা অনুযায়ী সহযোগিতা না পাইবার অভিযোগ করিয়াছেন। দুই মাস আগেও, পত্রিকান্তরের খবরে জানা গিয়াছিল, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খুরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছিল। কয়েক মাসে এই দুই উপজেলাসহ পাশের উপজেলাগুলিতে প্রায় ১০ হাজার গরু আক্রান্ত হয়, মারাও গিয়াছে বেশকিছু গরু-ছাগল।
বস্তুত দেশ জুড়িয়া গবাদিপশুর নানা রোগবালাইয়ের খবর নিয়মিতভাবেই প্রকাশিত হয় সংবাদপত্রে। গবাদিপশু সবচাইতে বেশি মারা যায় খুরা রোগে। মাঝেমধ্যে মড়কও দেখা দেয়, কেননা এই রোগ মারাত্মক ছোঁয়াচে প্রকৃতির। সরকারি তথ্য বলিতেছে, এই রোগের কারণে প্রতিবত্সর দেশের ১২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার ক্ষতি হয়। যেকোনো ঋতুতেই এই রোগ হইতে পারে, তবে সাধারণত বর্ষার শেষে ইহার প্রাদুর্ভাব প্রকট হয়। বয়স্ক গরুর মৃত্যু কম হইলেও বাছুর রক্ষা করা কঠিন। বর্তমানে খুরা রোগ প্রতিরোধে বিদেশ হইতে টিকা আমদানি করা হয়। তবে তাহা খুব কার্যকর নহে। উপরন্তু, আমদানিকৃত প্রতিটি টিকার দামও পড়ে কমপক্ষে ১২০ টাকা। ফলে উচ্চমূল্যের কারণে খামারিরা টিকা দিতে চাহে না।
দেশে গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার উত্পাদন কয়েকগুণ বাড়িয়াছে। বিশেষত তরুণদের মধ্যে পশুর খামার করিবার যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি হইয়াছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গরু পালনের এই প্রবণতা শুরু হয় ভারত সীমান্ত দিয়া গরু আসিবার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের পর। ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসিয়া গরুপাচার রোধে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করে। আনুষ্ঠানিক হিসাবে দেশে বত্সরে ২০ লক্ষাধিক গরু ভারত হইতে আসিত। ভারতীয় গরু আসা হ্রাস পাওয়ায় এখন দেশে খামার করিবার সুযোগ তৈরি হইয়াছে। তদুপরি, দেশকে দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ করিতে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে সরকারের ঋণদান কর্মসূচি গরু পালন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখিয়াছে। এই ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, কেননা অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটাইয়াও গরুর মাংস ও চামড়া বিক্রির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও খুলিতেছে। গবাদিপশুর রোগবালাই চিকিত্সায় বিজ্ঞান অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছে। তাই খুরা রোগসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে বড় খামারিরা এখন যথেষ্ট সচেতন। তবে গৃহস্থালি পর্যায়েও তাহা সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন, কারণ গবাদিপশু লালনপালনে গ্রামীণ কৃষিজীবী পরিবারগুলি এখনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করিতেছে। পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতার আরও সম্প্রসারণ।
