দলবদল ও নির্বাচন

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২৮

দেশজুড়ে এখন ভোটের হাওয়া বইছে। শহরে-নগরে-গ্রামে আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা মানুষের মুখে মুখে। এবার দেশের সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে অনেক আগ্রহ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা বরাবরের মতোই বিচিত্র। কেউ প্রার্থীদের পক্ষে জনমত দেখে কেউবা প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে, কেউবা পরিবর্তনের জন্য, কেউ দলের হয়ে ভোট দিতে চান।

গ্রামে এখন পুরোদস্তুর ধান কাটা ও মাড়াইয়ের মৌসুম। অগ্রহায়ণ মাসে গ্রামবাংলার চিরন্তন দৃশ্য এটি। ক্ষেতে-খামারে ব্যস্ত কৃষক। এই ব্যস্ততার মধ্যেও ভোটের হাওয়া লেগেছে তাদের গায়েও।

রাজধানীতে রাজনৈতিক দলগুলোতে চলছে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের ব্যস্ততা। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে আসছে বড় দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে নানা খবর। কোথাও কোথাও সম্ভাব্য প্রার্থীরা আছেন গণসংযোগে। কোথাও চলছে মনোনয়ন-বঞ্চিত প্রার্থীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ।

এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র মনোনয়ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে? তবে এর মধ্যে সুবিধাবাদী নেতাদের দল বদল, জার্সি বদল ও মার্কা বদলের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। আমাদের দেশে দলেরও যেমন শেষ নেই, মতেরও কোনো কমতি নেই। যত মাথা তত মত। এই ভিন্ন মতের অনুসারীরা আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মত বদলে দল পাল্টানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। রাজনীতির ময়দানে এ নিয়ে এখন নানামুখী আলোচনা। নিজেদের সুবিধামতো দল পরিবর্তন করছেন নেতারা। লক্ষ্য নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া।

রাজনীতির ময়দানে যাকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে দেখা গেছে, তিনি এখন পাল ভেড়াচ্ছেন ধানের শীষ তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। আবার ধান নিয়ে যিনি ব্যস্ত ছিলেন তিনি এখন এখন নৌকা নয়ত লাঙ্গলে ভিড়ছেন। যিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন তিনিও সরব হয়েছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলবদলের উত্সবে মেতে উঠেছেন অনেক নেতা। ক্ষমতার লোভে অনেকে আদর্শ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে ভুলছেন না। আওয়ামী পরিবারের সন্তানরাও বিনা দ্বিধায় হাত মিলাচ্ছেন বিপরীতমুখী রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে।

যেমন, বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। আর আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী যোগ দিয়েছেন গণফোরামে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা শামসের মবিন চৌধুরী এক সময়ে ছিলেন দলটির প্রাণ। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে তিনি দল ছেড়ে বেশ কিছুদিন নীরবেই ছিলেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের রাজনীতিতে হঠাত্ করেই সরব হন তিনি। ঘটা করেই যোগ দেন বিকল্পধারায়। পদ পান প্রেসিডিয়াম সদস্যের। আওয়ামী লীগের সঙ্গে একজোট হয়ে এখন তিনি নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করার অপেক্ষায় রয়েছেন। 

সাবেক সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপত্র কিনে চমক দেখিয়েছেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। প্রথমে তাকে এরশাদের সামরিক উপদেষ্টা, পরে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের সদস্য বানানো হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হয়ে নির্বাচন করছেন।

এক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মাহমুদুর রহমান মান্না ও কামাল হোসেন। তাদের কেউ কেউ এখন নৌকা প্রতীকের পরিবর্তে ধানের শীষ নির্বাচন করার অপেক্ষায়। ছাত্রদলের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি গোলাম সারোয়ার এখন বিকল্পধারায়। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী নাজিম উদ্দিন আল আজাদও বিকল্পধারায় যোগ দিয়ে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচনে লড়বেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া গণফোরামে যোগ দিয়েছেন।

বিএনপিপন্থি ডাক্তারদের পেশাজীবী সংগঠন ড্যাবের সাবেক সভাপতি ডা. রফিকুল ইসলামও রাজনীতিতে চমক দিয়েছেন। হঠাত্ করেই বিএনপি থেকে তিনি যোগ দিয়েছেন বিকল্পধারায়। দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ফারুক আলম সরকার বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। গাইবান্ধা-৫ আসন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছিলেন।

সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর-জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বিকল্পধারায় যোগ দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার ওমর ফারুকও যোগ দিয়েছেন বিকল্পধারায়। একই দলে যোগ দিয়েছেন কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আমছা আমিন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ২০০১ সালে কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হন।

অনেকেই বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলে রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের যোগ দেওয়ার অধিকার আছে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এটা ব্যক্তির অভিরুচি বা পছন্দও বটে। যেখানে মানুষ জীবনসঙ্গী পর্যন্ত বদল করেন, সেখানে রাজনৈতিক দল তো তুচ্ছ। তাছাড়া আমাদের দেশে আদর্শের রাজনীতি বলে এখন আর কিছু নেই। জিতে যাওয়া, টিকে থাকা, ক্ষমতার ভাগ পাওয়া এটাই তো নতুন যুগের ‘আদর্শ’। এই ‘আদর্শের’ পানে ধেয়ে চলেছেন আমাদের নেতানেত্রীরা।

এদিকে বিভিন্ন জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে চলছে বানরের পিঠা ভাগের মতো আসন ভাগাভাগি। বড় দলগুলো যতটা সম্ভব নিজের পাতে ঝোল টানতে ব্যস্ত। অন্যদিকে ছোট দলগুলো ‘বেশি আসন না দিলে তোমার সঙ্গে খেলব না’ বলে নিজেদের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভোটের এসব প্রক্রিয়ায় এখনও পর্যন্ত সাধারণ ভোটারদের ভূমিকা কেবলই দর্শকের। যদিও গণতন্ত্র বা ভোটাভুটি, সরকার গঠন এবং দেশ পরিচালনার ব্যাপারে দুটি জিনিসই মুখ্য— ভোটার এবং নেতা। নেতারা প্রত্যক্ষভাবে দেশ পরিচালনা করেন আর ভোটার ভোট দিয়ে তাদের দেশ চালাবার ব্যবস্থা করে দেয় অর্থাত্ দেশ চালানোর ব্যাপারে তারাও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ভোটার যদি ভালো মানুষকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করে তবে সেও সেই ভালো কাজে যুক্ত হলো আর দুর্নীতিবাজ নেতাকে নির্বাচন করলে সেও দুর্নীতিতে শামিল হলো।

একজন এমপি হওয়া— লাখ লাখ মানুষের নেতা হওয়াটা সহজ কাজ নয়। এ জন্য তাদের অনেক গুণের অধিকারী হতে হয়। নেতাদের গুণ সম্পর্কে একবার টাইম ম্যাগাজিনে একটা লেখা বের হয়েছিল। সেই লেখায় বলা হয়েছে, ‘নেতাদের অবশ্যই তিন ধরনের কাজ সম্পাদন করতে হয়— অনুসারীদের মঙ্গলের ব্যবস্থা করা, এমন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি করা যেটাতে সাধারণ লোকজন তুলনামূলকভাবে নিরাপত্তা বোধ করে এবং অনুসারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসের জোগান দেওয়া’।

এখন প্রশ্ন হলো, সকলেই কি এমন গুণের অধিকারী? এটা কি সকলেরই জন্মগত স্বাভাবিক গুণ? নিশ্চয়ই না। এমন গুণ সকলের থাকে না এবং এমন গুণ আয়ত্ত করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেক কষ্ট করতে হয়। তাহলে কেন যে কেউ ভোটে দাঁড়াবে? যে যার প্রয়োজনমতো দল বদলাবে? আমাদের দেশে ইচ্ছে করলেই যে কেউ যখন আমলা হতে পারে না, পুলিশ-আর্মি হতে পারে না, তবে যে কেউ কেন নেতা হতে পারবে?

কবি ইকবাল বলেছেন, ‘গণতন্ত্রে মাথা গোনা হয় মাথার মূল্যায়ন করা হয় না’। আর তা হয় না বলেই বেশিরভাগ গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ছে। গণতন্ত্রে ৪৯ টা ঘোড়ার থেকে ৫১ টা গাধার মতের মূল্য বেশি। ১০ জন মানুষ যদি আলোচনায় বসে যে, মানুষ খুন খারাপ না ভালো আর ৭ জনই খুনের পক্ষে হয় তবে তো ‘খুন’ ভালো বলে সিদ্ধান্ত আসবেই! এ জন্যই প্রাচীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ গণতন্ত্রকে মূর্খের শাসন এবং বিপজ্জনক সরকার ব্যবস্থা বলে মনে করতেন!

নির্বাচনী গণতন্ত্র ও ভোটের বাজারে তাহলে আমাদের মতো নাগরিক বা ভোটারদের ভূমিকা ও অবস্থান কী? যত কথাই আমরা বলি না কেন— ভোটারদের ক্ষমতা কেমন সেটা যারা কখনো নির্বাচন করেননি তাদের পক্ষে বাস্তবিকই বোঝা কঠিন।

n লেখক: রম্যরচয়িতা