নতুন কোথাও ঘুরতে যাবার আগে সেই দেশ বা শহরটি সম্পর্কে সবারই কিছু না কিছু ধারণা থাকে। সেই দেশটি কেমন—সে ব্যাপারে অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। নিজে থেকেও অনেকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনলাইন থেকে জেনে নেন। আমি যখন প্রথম বাংলাদেশে ঘুরতে আসি, আমারও আর দশজনের মতো বাংলাদেশের ব্যাপারে কিছু নেতিবাচক ধারণা মাথায় ঢুকে পড়ে। যখন লন্ডন, ব্রাসেলস, রোম কিংবা প্যারিসে ঘুরতে যাই, তখন নানান সময় নানা স্তরে অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হয়। দুঃখজনকভাবে তাদের অনেকেই হয়তো রেস্তোরাঁয় কাজ করেন কিংবা পথের মধ্যে গোলাপফুল বিক্রি করেন। সুতরাং বাংলাদেশ ভ্রমণের আগে দেশটির ব্যাপারে আমার কিছু নেতিবাচক ধারণা এমনিতেই জন্ম নেয়। আমি ভেবেছিলাম দিল্লির তুলনায় বাংলাদেশ আরো কিছুটা বিশৃঙ্খল এবং নোংরা। আমার ধারণা ভুল ছিল!
আমি ইউরোপের একটি বিশেষ দলের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ভ্রমণ করি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশেষ আমন্ত্রণের এই ভ্রমণে একটি অংশে আমাদের সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। এই ভ্রমণে আমার সঙ্গে এমন অনেক নারীর দেখা হয়, যারা মননে-শিক্ষণে আধুনিক, চমত্কার। এমনকী আমাদের হোটেলের স্টাফদের ভেতরেও পুরুষের পাশাপশি নারীরা সমানতালে সেবাদানে নিয়োজিত ছিলেন, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদও ছিল আকর্ষণীয়, চৌকস, আধুনিক। আমাদের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য—ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট মেম্বার ক্রিসটেল লেচভ্যালিয়ার বললেন, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি এত বিপুল সংখ্যক নারীকর্মীর স্বচ্ছন্দে কাজ করে যাওয়ার ঘটনাটি একটি বিশেষ বার্তা দেয়, আর তা হলো— বাংলাদেশের নারীরা সামাজিক পরিবেশে সহজাতভাবেই নিরাপদ। সত্যিকার অর্থে, সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অগ্রগতি তাক লাগানোর মতো। ওর্য়াল্ড ইকোনোমিকস ফোরাম্স-এর গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স ফর ২০১৮-এর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা ৪৭তম। বিস্ময়করভাবে এই সূচকে ‘জেন্ডার ইক্যুয়াল’ বা লিঙ্গ সমতায় এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশের আগে কেবল রয়েছে ফিলিপাইনস।
যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়. তখন তার একটি কথা ভীষণ মনে ধরে। তিনি বলেছেন, ‘আমার ১৬ কোটি মুখ রয়েছে, যাদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থান করতে হয় এবং আমাদের সরকারের লক্ষ্য হলো, এই ১৬ কোটি মানুষের জন্য একটি নিশ্চিত ভালো জীবন উপহার দেওয়া যাতে তারা শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে বসবাস করতে পারে।’
আমরা বিভিন্ন সেক্টরের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাত্ করি, বিস্ময়করভাবে দেখতে পাই নারীর ক্ষমতায়নের চিত্র। শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকার মেয়েশিশুর জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত মেয়ে এবং নারীর সংখ্যাবৃদ্ধির অর্থ হলো কর্মক্ষেত্রেও নারীর সরব উপস্থিতির সুযোগ ঘটা।
আমি নিজে একজন উদ্যোক্তা। আমি শুনেছি ২০১০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিন সেক্টরে প্রায় ৮৬ কোটি ডলার সমতুল্য ঋণ বিতরণ করা হয় ৫৭ হাজার নারী উদ্যোক্তার মধ্যে। ২০১৬ সালে ১১ হাজার নারী প্রায় ১২ লক্ষ ডলার ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করেন। ২ কোটি বাংলাদেশি নারী বিভিন্ন সেক্টরে কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়াও ৩০ লক্ষ নারী তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত। সার্বিকভাবে পুরো চিত্রটাই অভাবিত, চমত্কার।
গত ১০ বছরে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার প্রগতিমুখী উন্নয়নের জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার, সেগুলো করেছে অত্যন্ত কার্যকর উপায়ে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে, তিনি তার দেশের মাটি কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহূত হতে দেবেন না। বাংলাদেশের বিদেশনীতিও চমত্কার—বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, বিদ্বেষ নয় কারো সঙ্গে।
আমার দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা হলেন নারীর ক্ষমতায়নের রোল মডেল। কোনো সন্দেহ নেই যে, ১৬ কোটি জনগণের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংক্রান্ত জটিলতা—সব কিছু দারুণ দক্ষতায় সামলাচ্ছেন তিনি। ইইউ প্রতিনিধিদলের নেতা মিস্টার হেনরি ম্যালোসি আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন যে, গত দশ বছরে আওয়ামী সরকার বাংলাদেশকে একটি গরিবতর দেশ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশে রূপান্তর করেছেন। গত বছর এই হার ছিল ৭.৯!
আমি আমার পরবর্তী বাংলাদেশ-সফরের জন্য মুখিয়ে আছি।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : তাপস কুমার
n লেখক : উইমেন্স ইকোনোমিক ও সোশ্যাল থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, ইউরোপিয়ান ইকোনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিটি, ব্রাসেলস
