সোশ্যাল মিডিয়া

যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও পরিণতি

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২৯

সোশ্যাল মিডিয়ার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক দেশের তরুণ-কিশোরসহ সব মহলে ঝড় তুলেছে। এ ঝড় নিজেকে উপস্থাপনের হিরোইজমে রূপ নেয়। ফেসবুকের ব্যবহার, ব্যবহারে সহজবোধ্যতা প্রায় সব বয়সের মানুষকে সম্পৃক্ত করেছে। যারা সম্পৃক্ত হয় নাই— হয় তারা জানে না কীভাবে পরিচালনা করতে হয় কিংবা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা। ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তিও হচ্ছে পরিচিত। ভেঙে যাচ্ছে বন্ধুত্ব তৈরির সকল বৈশিষ্ট্য।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসের সময়, মসজিদ-মন্দিরে প্রার্থনার সময়, খাবার সময় এমনকি টয়লেটে গিয়েও ছবি তুলে ফেসবুকে প্রচার ও প্রদর্শন করে থাকে। ছবির ওপরে লিখছেও ‘আমাকে কেমন লাগছে’ কিংবা আজ নামাজের সময় বা নামাজের পরে। ফেসবুকের এই ধাপে আমরা চাই, ফেসবুকের ছবিতে লাইক কেমন পড়েছে। কমেন্ট কত পড়ল। এসব প্রতিযোগিতায় সময় পার হয় তরুণ-তরুণীদের। বাংলার মাটিতে ফেসবুক হোক সত্যিকার অর্থে মানুষে-মানুষে সংযোগের মাধ্যম। কিন্তু সেখানে সংস্কৃতি ও রুচির স্পষ্ট ছাপ থাকবে, থাকবে ব্যক্তিত্ব। বন্ধুত্বের একটি যোগসূত্র থাকবে, যে যোগসূত্রের ভিত্তিতে আমরা বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবো। এর বাইরে যা কিছু হবে তার পরিণতি হবে ধ্বংস, হত্যা, নির্যাতন কিংবা সম্মানহানি।

তরুণ সমাজের প্রায় সবাই আজ ফেসবুকের তাড়নায় তাড়িত এবং ঘরে-বাহিরে তটস্থ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের সজাগ হওয়াটা জরুরি, সে ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে নেওয়া যেতে পারে:

(ক) অভিভাবকদের দৃঢ় অঙ্গীকার করা যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়া পর্যন্ত সন্তানকে কোনো স্মার্টফোন কিনে দেওয়া যাবে না। যোগাযোগের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে এ্যানালগ মোবাইল কিনে দেওয়া যেতে পারে। অভিভাবকদের বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সন্তানদের ভার্চুয়াল জগতের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে পুঁজিবাদের খপ্পর এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নে আপনার সন্তান বিপথে গেলে তার দায়ভার আপনাকেই বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার বিকল্প নাই।

(খ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। অনেক শিক্ষকও ফেসবুক জ্বরে আক্রান্ত। সামাজিক আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, মূল্যবোধ শেখার অন্যতম ভরসাময় জায়গা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা উচিত। ক্লাস চলাকালীন কিংবা স্কুল-কলেজে অবস্থানকালীন কারো নিকট কোনো ধরনের মোবাইল ফোন রাখতে দেওয়া উচিত নয়।

(গ) আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনেক দুর্বল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই দূর্বল ভূমিকার সুযোগে তরুণ সমাজ প্রযুক্তিকে আপন ভেবে বন্ধুত্বের খপ্পরে পড়ে কেউ আত্মহত্যা করছে, কেউ হতাশাগ্রস্থ হচ্ছে, কেউ সম্মানের ভয়ে কাবু হয়ে পড়ছে। উপায় কী? উপায় আমাদের জানা, কিন্তু এর বাস্তবায়ন আমাদের পক্ষে কতটা সম্ভব—এটাই প্রশ্ন।

 সমাজকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির উপাদানের সঙ্গে পরিচিতি করা এবং ভালোলাগা তৈরি না করা যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপায়ে মজা খুঁজবে, খুঁজবে বিনোদন। আর এই প্রযুক্তিগত বিনোদনে বিপদের মাত্রা বেশি, জীবনের ঝুঁকি বেশি। ব্যক্তি সংস্কৃতিবিমুখ হলে কিংবা অপসংস্কৃতিতে আসক্ত হলে সে নিজেই একটি বোমাসদৃশ। ফেসবুক বন্ধুদের প্রসঙ্গে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। বন্ধুত্ব থাকবে নির্দিষ্ট মাত্রা ও মেজাজ ও শালীনতায়।

n লেখক : সাংবাদিক