সুন্দরবনে বাড়ছে প্লাস্টিক দূষণ, হুমকিতে প্রাণী ও গাছপালা

আপডেট : ২৭ মে ২০২৫, ১৮:২৬

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে পরিবেশ দূষণ। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্ট, মাছ-কাঁকড়ার আড়ৎ, বাজার ও নদীপাড়ের বসত বাড়ির ব্যবহৃত প্লাস্টিক ও পলিথিনসহ সকল প্রকার ময়লা আবর্জনা বহু বছর ধরে ফেলা হচ্ছে সুন্দরবনের নদীতে। ফলে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণে আক্রান্ত হচ্ছে বৃহৎ এই বনটি। 

তথ্য বলছে, বনের মাটি ও পানিতে উদ্বেগজনক হারে মিলেছে মাইক্রো-প্লাস্টিকের উপস্থিতি। এই প্লাস্টিক দূষণ হুমকি বাড়াচ্ছে জলজ-স্থল বন্যপ্রাণী ও বনের গাছপালার। বনের যেসব এলাকায় মানুষের যাতায়াত বেশি সেখানে প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণও বেশি। 

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার জিয়াউর রহমান বলেন, পলিথিন পোড়ালে বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়। এগুলো শ্বাসনালীর প্রদাহ, অ্যাজমা, এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পলিথিন ধীরে ধীরে ছোটছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, যা খাদ্য ও পানির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্তে প্রবাহ, এবং দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। নদী-নালা বা সমুদ্রের পলিথিন বর্জ্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদকে বিষাক্ত করে তুলছে। পলিথিন ব্যবহার থেকে সকলের বিরত থাকা উচিত বলে জানান এই চিকিৎসক। 

সুন্দরবনের নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে পানি দূষণ বেড়েছে। ফলে বনের প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পশুপাখির জীবনমান হ্রাস পাচ্ছে। জোয়ার-ভাটায় বন সংলগ্ন লোকালয় থেকে আসা বর্জ্য নদীর পানিতে ভেসে থাকতে দেখা যায়। এছাড়াও বন সংলগ্ন গ্রামের নদী-খাল হয়ে জোয়ারের সময় ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্য ও বর্জ্য প্রভৃতি বনের মধ্যে চলে যাচ্ছে। পচনশীল পণ্য না হওয়ায় মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে প্লাস্টিকজাতীয় এই দ্রব্য। 

লেখক-গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ময়লা-আবর্জনা প্রভৃতি বহুবছর ধরে ফেলা হচ্ছে সুন্দরবনের নদীতে। যা বন, নদী ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। প্লাস্টিকসামগ্রী ক্ষয় হতে হাজার বছরেরও বেশি সময় লাগে। এগুলো অপচনশীল দ্রব্য।

পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব- যেমন: পাটের, বেতের, কাপড়ের বা কাগজের ব্যাগের ব্যবহার বৃদ্ধি করার কথা উল্লেখ করেন তিনি। 

সাতক্ষীরা জেলার বিশেষ আকর্ষণ ‘সড়ক পথে সুন্দরবন দর্শন’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি দেখার জন্য বিদেশ থেকে বহু পর্যটক শ্যামনগর উপজেলা মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর এলাকাতে আসে। এ এলাকায় সারাবছর দেশের পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। তবে আজ পর্যন্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ করেন পর্যটন এলাকার মানুষেরা। 

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটক ও বনজীবীরা নদী-জঙ্গলের মধ্যে পলিথিন-প্লাস্টিকের পণ্য, অপচনশীল দ্রব্য ফেলে থাকেন বলে জানান স্থানীয়রা। 

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের কাছে সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটকদের করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুন্দরবন ভ্রমণে গেলে কোনভাবেই প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলার সুযোগ থাকে না, কারণ বনবিভাগের পক্ষ থেকে গাইটম্যান দেওয়া হয় প্রতি ট্রলারে একজন করে। সুন্দরবনে ও নদীতে প্লাস্টিক ও পলিথিনের মত বর্জ্য ফেললে তাকে আইনের আওতায় এনে জরিমানা করা হয়।

এছাড়াও, পর্যটকবাহী ট্রলারে কোনপ্রকার প্লাস্টিক দ্রব্য বহন করতে দেওয়া হয় না বলে জানান তিনি। 

উপকূলীয় এলাকায় সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে এ সমস্ত প্লাস্টিক বস্তা বন্দি করে ফেলা হয় নদীতে। তবে, এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন করা হলে নদীতে আর বর্জ্য-প্লাস্টিক ফেলবেন না বলে জানান স্থানীয়রা। 

নীলডুমুর বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমএ হালিম বলেন, আমাদের বাজার এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করতে আসেন। অনেকেই পলিথিন, প্লাস্টিক যাবতীয় বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে যায়। এই ময়লা আমাদের দোকানিরা পরিষ্কার করেন। পরবর্তীতে জমানো ওই বর্জ্য নদীতে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।  

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, কাশিমাড়ী, আটুলিয়া, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, কৈখালী, রমজাননগর, নুরনগর, পদ্মপুকুর ও গাবুরা ইউনিয়নসহ আশপাশের দোকানের বর্জ্য, কলকারখানা, ইটভাটা, ক্লিনিক-প্যাথলজির প্লাস্টিক-পলিথিনসহ বিভিন্ন আবর্জনা আদি যমুনা নদীসহ সুন্দরবনস্থ খালে বিলে ফেলা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, পলিথিন সহজে মাটিতে মিশে না। এটি মাটির উপরে একটি আস্তরণ তৈরি করে, যার ফলে মাটির স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। পলিথিনের উপস্থিতি মাটিতে উপকারী জীবাণু ও কীটপতঙ্গের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে, ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়। পলিথিনের কারণে মাটিতে পানি জমে থাকে, ফলে ফসল নষ্ট হয় এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পলিথিন উৎপাদনের সময় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ মাটিতে মিশে গিয়ে মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যায়। 

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার তুষার মজুমদার বলেন, পলিথিনের কণা নদী, খালের পানি দূষিত করে। মাছের প্রজননে ব্যাহতসহ মৎস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। পলিথিন পানিতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে, ফলে পানির গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং মানুষের জন্য পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে। 

নদীকেন্দ্রিক বাজারগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি করার পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রনী খাতুন বলেন, আমরা উপকূলের নদীর ধারে অবস্থিত বাজারকেন্দ্রীক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি করব।

ইত্তেফাক/এএইচপি