শতভাগ বিশুদ্ধ গণতন্ত্র বা অবিতর্কিত নির্বাচন বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশেই সম্ভব নয়। কাজেই গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অনিয়ম মেনে নিয়েই নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এক সময় আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় হোন্ডা-গুণ্ডার কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে ফেলা, মিডিয়া ক্যু ইত্যাদি ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। এইসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর শক্তি-সাহস বা কোনো সুযোগও তখন ছিল না আর জানালেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যেত না। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হতো না—কারণ ভোট দেওয়ার প্রয়োজনও হতো না। ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, ক্ষমতাসীনদের নির্দেশ মতোই নির্বাচন কমিশনকে বিজয়ী প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করতে হতো। এছাড়া প্রায় প্রতিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ভয়াবহ সংঘাত-সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনাও আমাদের দেশে ঘটেছে। গণমাধ্যমও ছিল সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে। দেশের খবর জানতে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকাসহ বিভিন্ন বিদেশি গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও নির্বাচনী ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েই ভালো। তবে এই অবস্থার আরো উন্নতি প্রয়োজন। এজন্য সকল পক্ষকেই নমনীয় ও সহনশীল হতে হবে। বয়কট-বর্জন, সংঘাত-সংঘর্ষ ও প্রতিহিংসার পথ পরিহার করে সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। বিতর্কিত মন্তব্য করে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়।
সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সার্বিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনকালীন সরকার ও প্রশাসনের সহায়তায় কমিশনকেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সকল ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার বা ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যর্থ হলে কমিশনকে অবশ্যই জাতির কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সকল দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং একইসঙ্গে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নিতে হবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা। কমিশনের কোনো বিতর্কিত পদক্ষেপ বা কোনো সদস্যের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য যাতে নির্বাচনী পরিবেশকে বিতর্কিত করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে অবশ্যই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এক সময় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতির কবল থেকেও দেশ ধীরে ধীরে মুক্ত হতে চলেছে। ব্যাপক উত্সাহ, উদ্দীপনা আর অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়েই মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। এখনও পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোথাও কোনো বড় ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সুতরাং নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ বিবেচনায় একটি ভালো নির্বাচনের দিকেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হয়।
আমরা একটি সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে চাই। বর্তমানে দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৪২ লক্ষ, আর এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি তরুণ অর্থাত্ যাদের বয়স ১৮ থেকে ৪০। এই তরুণ প্রজন্মই আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কারণ তাদের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপরই দেশের ভবিষ্যত্ নির্ভর করছে।
ফরিদপুর
