সাতক্ষীরার শ্যামনগর সংলগ্ন সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মাঝে ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি ও ‘মন্থা’ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে উপকূলবাসীর উৎকণ্ঠা ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নিয়ে। মে মাস এলেই ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক বাড়তে থাকে উপকূলের লোকজনের মধ্যে।
চলতি মে মাসের শেষদিকে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সম্ভাব্য দুটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছে ‘শক্তি ও ‘মন্থা’।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৯-৩১ মে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে যাওয়া সম্ভাব্য লঘুচাপ বা নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড় ভারতের ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের খুলনা-চট্টগ্রাম উপকূলে প্রভাব ফেলতে পারে। সম্ভাব্য এই দুর্যোগ ৩১ মে’র মধ্যে ওড়িশা-মায়ানমার সীমান্তবর্তী উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুন্দরবন সংলগ্ন দাঁতিনাখালী গ্রামের খালেকুল গাজী (৪৫) জানান, গত চার বছরের মধ্যে তিনবার ঘূর্ণিঝড়ে বেড়িবাঁধ ভাঙনের পাশাপাশি তার বসতঘরও ভেঙেছিল। এসব পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নতুন ঘর তুলে এখন বাঁধের পাশে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। আবারও ঝড়ের সংকেত শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
সরজমিনে, সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার বহু মানুষ উৎকণ্ঠা নিয়ে বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন।ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা উপকূলের মানুষের মাঝে নদীর বাঁধ ভাঙনের আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের আশঙ্কা, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে বেড়িবাঁধটি উপচে কিংবা ভেঙে পুরো এলাকা লোনাপানিতে ভেসে যাবে।
সুন্দরবন সংলগ্ন মালঞ্চ নদীতীরবর্তী দাঁতিনাখালী গ্রামের বাসিন্দা জহুরা বিবি (৪০) বলেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার সময় নিজেদের বাড়িঘর জায়গাজমি সব নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সেই থেকে বাঁধের পাশে কোনোরকমে বসবাস করছি। প্রতিবছর একটা না একটা দুর্যোগ লেগেই আছে।
সিংহড়তলী গ্রামের প্রভাষ মণ্ডল বলেন, ঝড় এলেই সবাই সাইক্লোন শেল্টারে যেতে বলে। কিন্তু আমাদের মালামাল কোথায় রেখে যাব। আমরা গরিব মানুষ সম্পদের মধ্যে আছেই শুধু গরু, ছাগল এবং মাছ ধরার জাল ও নৌকা। এইগুলো রেখে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।
নতুন করে দুটি ঘূর্ণিঝড়ের বার্তা উপকূলবাসীকে রীতিমতো দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল বেড়িবাঁধ নিয়ে আতঙ্কে উপকূলীয় জনপদে বসবাসকারী জনসাধারণ। কারণ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ চললেও বেশ কিছু স্থান এখনো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ২০ কিলোমিটার জরাজীর্ণ ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। বাঁধের ওই অংশ ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট প্লাবন মোকাবেলার সক্ষমতা রাখে না। এমনকি চলতি বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা দাবি করছেন, উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ অনেকটাই সংস্কার করা হয়েছে। আরও কিছু এলাকা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে।
তবে সরেজমিন পরিদর্শনের- পাউবো কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায়নি।
সূত্রে জানা গেছে, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে নেওয়া প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের কাজ ধীরগতিতে চলছে। এক হাজার ২৩ কোটি টাকার সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার নম্বর-১৫ পুনর্বাসন শীর্ষক একটি প্রকল্প ২০২১ সালে এবং ২০২২ সালে একনেকে পাস হয়। এই মেগাপ্রকল্পগুলোর পাশাপাশি বেশ কিছু ছোট প্রকল্প নেওয়া হয়। সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার নং-১৫ পুনর্বাসন প্রকল্প ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বেড়িবাঁধের কাজ সম্পূর্ণ করার কথা থাকলেও আবারও ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সময়মতও মেরামতের উদ্যোগ নিলে কম খরচ ও কম সময়ের মধ্যে মানসম্মত কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বর্ষার আগমুহূর্তে নদীতে জোয়ারের পানি বাড়লে পাউবো কর্তৃপক্ষ বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেয়। এতে একদিকে খরচ বাড়ে, অন্যদিকে তড়িঘড়িতে কাজ হয় নিম্নমানের। ফলে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকার ঝুঁকি কমছে না, বরং বাড়ছে।
সাতক্ষীরা উপকূলীয় বেশ কিছু এলাকায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানান সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (শ্যামনগর পওর উপ-বিভাগ) মো. ইমরান সরদার।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রনী খাতুন বলেন, এখনো আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের খবরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গত ১৫ মে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসন সার্বিক বিষয় সবসময় নজরদারিতে রাখবে বলে জানান তিনি।
