এক জীবনের গান

স্বপ্ন দেখার, হার না মানার এক অনবদ্য জীবন কাহিনী

আপডেট : ০১ জুন ২০২৫, ২০:৪১

জীবন সবসময় সহজ গল্প লিখে না। কিছু গল্প এমন, যেগুলো কাঁটার মতো ধীরে ধীরে গেঁথে যায় হৃদয়ের গভীরে যন্ত্রণার মধ্যেও জন্ম দেয় সৌন্দর্যের। সালেহ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘এক জীবনের গান’ ঠিক তেমনই এক আত্মকথা, যা নিছক স্মৃতিচারণ নয়; বরং এটি এক জীবনদর্শনের সংকলন, এক বর্ণাঢ্য যাত্রার অনুপম কাব্যকথা।

বইটি শুরু হয় এক প্রত্যন্ত গ্রামে, সিলেটের মুইগড় নামের এক অখ্যাত জায়গা থেকে, যেখানে লেখকের জন্ম। শৈশবের দারিদ্র্য, ভাঙা ছনের ঘর, অনাহার আর অনিশ্চয়তার জীবন এসব বর্ণনায় পাঠক যেন চোখের সামনে দেখতে পান একটি আটপৌরে বাস্তবতা, যা আমাদের দেশের বহু মানুষ প্রতিদিন বয়ে বেড়ান। কিন্তু এই বাস্তবতা থেকেই উঠে আসে এক বর্ণিল সংগ্রামের সূচনা।

সালেহ হোসেন শুধু নিজের কাহিনী বলেননি, তিনি সেইসব মানুষের কথাও বলেছেন, যাদের জীবন কখনও বই হয়ে ওঠে না যারা হেরে যেতে যেতে একদিন জিতে যান, নীরবে।

লেখক তার লেখায় এক চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। কোথাও আবেগে ভেসে যাননি, আবার কোথাও নিছক কৃতিত্বের বিবরণে আটকে থাকেননি। বরং তিনি পাঠককে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন তার জীবনের নানা মোড়ে কখনো শৈশবের সরলতায়, কখনো মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর সাহসিকতায়, কখনো যুবকের উদ্বাস্তু জীবনে আবার কখনো বিদেশ বিভূঁইয়ে পা রাখা এক স্বপ্নবাজের সংকল্পে।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ভাষার সরলতা ও আবেগের সত্যতা। সালেহ হোসেন কোনো জটিল শব্দজালে পাঠককে আটকাতে চাননি। বরং তিনি গল্প বলেছেন বন্ধুর মতো সত্য, সরল আর খোলামেলা ভঙ্গিতে। তার প্রতিটি অনুচ্ছেদে আছে অভিজ্ঞতার রক্তমাংস, স্মৃতির সুর ও বাস্তবতার গন্ধ। বিশেষ করে মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা এবং জীবনের নানা প্রান্তে মায়ের ছায়া এগুলো এত আন্তরিকভাবে বর্ণিত হয়েছে যে পাঠকের চোখ বারবার ভিজে আসে।

তবে শুধু আবেগ নয়, “এক জীবনের গান” একটি দৃষ্টিভঙ্গির বই। এটি বলে, সমাজ বা পারিবারিক পটভূমি যত প্রতীক‚লই হোক, ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিই তার নিয়তি নির্ধারণ করে। লেখকের ছাত্রজীবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, শিক্ষকতার দিন, নাইজেরিয়ায় পাড়ি দেওয়া এবং কানাডায় এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার কাহিনী প্রমাণ করে যে সীমাবদ্ধতাই সব নয়। এগুলো মানুষকে গড়েও, ভাঙেও আপনার কেমন মানুষ হতে হবে, তা ঠিক করেন আপনি নিজেই।

লেখকের প্রাঞ্জল ও সহজ ভাষা পাঠকের সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। কোনো অলঙ্কারবদ্ধ বাক্য নয়, বরং সরল ও অকপট বর্ণনাই পাঠককে বারবার থমকে দেয়। সালেহ হোসেনের মায়ের প্রতি ভালোবাসা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, শিক্ষার প্রতি অনমনীয় আগ্রহ এবং আত্মমর্যাদার প্রতি নিষ্ঠা সব মিলিয়ে এই আত্মজীবনী হয়ে ওঠে এক অনুপ্রেরণার পাঠ। বিশেষ করে, তার পেশাগত সাফল্য একজন দরিদ্র কিশোর থেকে শুরু করে সাফল্যের কাহিনী যেন শুধু একটি ব্যক্তির জয় নয়, এটি সেই সমাজব্যবস্থার প্রতিও এক প্রশ্ন, যেখানে সুযোগের অভাব মানেই অনেক স্বপ্নের মৃত্যু।

বইটিতে একাধিকবার উঠে এসেছে ‘মা’ চরিত্রটি যিনি শুধু লেখকের জীবনে নয়, পুরো কাহিনীর আবেগপ্রবাহের মূল কেন্দ্র। তার নিঃশর্ত ভালোবাসা, ত্যাগ আর পরামর্শ যেন ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে লেখককে। বাংলা সাহিত্যে মাতৃচরিত্রের বহু রূপ দেখা গেলেও সালেহ হোসেনের ‘মা’ পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে নিঃসন্দেহে।

এই বই শুধু আত্মজীবনী হিসেবে নয়, সমাজতাত্ত্বিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের শেখায়, দারিদ্র্য কখনোই স্বপ্নের পরিপন্থী নয় বরং তা হতে পারে জেদ ও প্রতিজ্ঞার জন্মস্থল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাফল্য একদিনে আসে না তা ধাপে ধাপে, অশ্রু আর ঘামে ভিজে গড়ে ওঠে।

অবশ্য কিছু জায়গায় পাঠক হয়তো আরও কিছু বিশদ বর্ণনার অপেক্ষায় থাকবেন। বিশেষ করে বিদেশে প্রথম জীবনের সংগ্রাম বা কর্পোরেট জগতে তার পথচলা এই অংশগুলো আরেকটু বিস্তারিত হলে হয়তো বইটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতো। তবু, এই কিছুটা অনুপস্থিতিও বইয়ের গঠনমূলক বিন্যাসকে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত করে না।

‘এক জীবনের গান’ এক বসায় পড়ে ফেলার মতো বই নয় এটি বারবার পড়ার, ভাবার ও অনুভব করার মতো। এটি স্বপ্ন দেখার, হার না মানার, এবং নিজের গল্প নিজেই লেখার এক অনবদ্য আহ্বান। বর্তমান প্রজন্মের জন্য এই বই হতে পারে আত্মবিশ্বাসের চাবিকাঠি, আর আগামী প্রজন্মের জন্য এটি থাকবে একটি জীবন্ত অনুপ্রেরণার মতো।

সংযোগ প্রকাশ থেকে ৬৪৮ পৃষ্ঠার এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন আল নোমান। বইটি অনলাইন বুকশপ থেকে অথবা প্রকাশনা থেকেও সংগ্রহ করতে পারবেন। বইটির মূল্য ১২০০ টাকা। 

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, এই আত্মজীবনী আমাদের শেখায়, জীবন আসলে এক গানই কখনো বিষাদের, কখনো আনন্দের, কখনো যুদ্ধের, কখনো ভালোবাসার। আর সেই গানের প্রতিটি লাইন জুড়ে লেখা থাকে, “আমি পেরেছি, তুমিও পারবে।” 

ইত্তেফাক/এএইচপি